দেবহাটার মো. আমিরুল ইসলাম—একসময় ছিলেন দিশেহারা, আজ তিনি আশেপাশের চাষিদের জন্য অনুকরণীয় দিশারি। আগে যেখানে চিংড়ি চাষে বারবার লোকসানের কারণে সংসার চালানোই হয়ে উঠেছিল কষ্টকর, এখন তিনি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চাষে সফল হয়ে গড়ে তুলেছেন ভাগ্যবদলের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কয়েক বছর আগেও তাঁর ঘেরে চিংড়ি বারবার রোগে মারা যেত। প্রতিবার চাষে লোকসান গুনতে গুনতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত জীবনে তখনই আশার আলো হয়ে আসে মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট (SCMFP)। দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় আমিরুলের ঘের উন্নয়ন ও নতুন যাত্রা।
অনুদান ও সহায়তা
মৎস্য দপ্তর তাঁকে মোট ২,১৪,৬৭৮ টাকা অনুদান প্রদান করে। এ অর্থে তিনি সংগ্রহ করেন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ—মানসম্মত খাদ্য, চুন, ব্লিচিং, মোলাসেস, প্রোবায়োটিকস এবং ভাইরাসমুক্ত পোস্ট-লার্ভা (PL)। বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত পরামর্শে ঘের ব্যবস্থাপনায় আসে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন। তিনি এখন ঘেরের মাটি ও পানির মান পরীক্ষা করতে পারেন এবং প্রতিটি ধাপ লিখিতভাবে রেকর্ড রাখেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা
আগে হঠাৎ বৃষ্টিপাত, পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার পরিবর্তনে উৎপাদন কমে যেত। কিন্তু এখন আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এসব ঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব হয়েছে। ফলে রোগের প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে এবং উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ।
সাফল্যের গল্প
বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত ইনপুট ব্যবহারের ফলে এবার আমিরুলের ঘের হয়ে ওঠে লাভজনক। আগে যেখানে উৎপাদন ছিল মাত্র ১.৮ কেজি/শতাংশ, সেখানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.২ কেজি/শতাংশ। এক মৌসুমে তিনি উৎপাদন করেছেন ৬২৫ কেজি চিংড়ি, যা বিক্রি করে আয় হয়েছে ৯,০৬,২৫০ টাকা। অর্থাৎ এক মৌসুমেই তিনি অর্জন করেছেন প্রায় ৯ লাখ টাকা নিট লাভ।
আয়ের ফলে আমিরুল এখন সন্তানদের শিক্ষার খরচ বহন করতে পারছেন, উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছেন এবং জমিও কিনেছেন। সংসারে যেখানে আগে ছিল অনিশ্চয়তা, সেখানে এখন এসেছে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য।
আবেগঘন কৃতজ্ঞতা
আমিরুল ইসলাম আবেগভরে বলেন, “চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমার জীবনমান উন্নয়নের জন্য মৎস্য অফিস যা করেছে, তা নিজের বাবা-মা কিংবা আত্মীয়-স্বজনও করে না।”
একসময় লোকসানে দিশেহারা আমিরুল আজ দেবহাটার চাষিদের কাছে রোল মডেল। তাঁর সাফল্যের গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেক চাষি ঘের উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষে এগিয়ে আসছেন। মৎস্য অফিসের সময়োপযোগী অনুদান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আমিরুল ইসলামের দৃঢ় মনোবল মিলেই সম্ভব হয়েছে এই স্বপ্নের সাফল্য।







