জলবায়ু পরিবর্তন: মাছের সঙ্গে ধান চাষ, জমির ব্যবহার ১২ মাস!

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
আলী মুক্তাদা হৃদয়

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ সাতক্ষীরার তালায় বর্ষা এলেই অনেক নিচু জমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকে। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা ও মৌসুমি আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এসব জমিতে সারা বছর প্রচলিত কৃষিকাজ করা কঠিন। তাই বছরের একটি বড় সময় জমি পড়ে থাকে অনাবাদি। তবে সেই জলাবদ্ধতাকেই এখন উৎপাদনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন তালা সদর ইউনিয়নের মাঝিয়াড়া এলাকার কৃষক ও জমির মালিকরা।

প্রায় ৫০ বিঘা এক ফসলি জমি নিয়ে গড়ে ওঠা খড়ের ডাঙ্গা-বাঁশখালী বিলে প্রায় দুই দশক ধরে চলছে মৎস্যচাষ। বর্ষার পানি ধরে রেখে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি পানি কমে গেলে একই জমিতে ধান চাষ করা হচ্ছে। এতে একদিকে দীর্ঘসময় পতিত থাকা জমি উৎপাদনের আওতায় এসেছে, অন্যদিকে জমির মালিকেরা নিয়মিত হারি (জমি ভাড়া) দিয়ে টাকা পাওয়ার পাশাপাশি বছরে একবার ধান ঘরে তোলার সুযোগ পাচ্ছেন।

তালা সদর ইউনিয়নের মাঝিয়াড়া এলাকার বর্ষাকালে জমিতে পানি জমে থাকায় বছরের একটি বড় সময় সেখানে ধান চাষ করা সম্ভব হয় না। পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে শ্যাওলা, কচুরিপানা ও আবর্জনা জমে থাকায় নতুন করে জমি প্রস্তুত করতেও বাড়তি শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
স্থানীয় জমির মালিক আব্দুল গফুর জানান, খড়ের ডাঙ্গা বিলে তাদের প্রায় ১০ বিঘা জমি রয়েছে। ঘের মালিক নিয়মিত জমির হারি পরিশোধ করেন। পাশাপাশি বছরে একবার ধান চাষ করে ফসল ঘরে তোলার সুযোগও রয়েছে।

তিনি বলেন, আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন এবং বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় আগে এ এলাকার জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ত। অনেক সময় জমি প্রস্তুতের খরচও উঠে আসত না। এখন জমির পানিকে কাজে লাগিয়ে মৎস্যচাষের পাশাপাশি মৌসুমে ধান চাষ করা যাচ্ছে। এতে পরিবর্তিত আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে একই জমি থেকে সারা বছর আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রভাব হিসেবে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনার সংকটকে দেখা হয়। কোথাও অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, কোথাও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দুই ধরনের পরিস্থিতিই কৃষিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে জমিতে লবণসহিষ্ণু ধান যেমন বিনাধান-১০, বিনাধান-২৩, ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯৭/৯৯-এর মতো জাত অঞ্চল ও মৌসুমভেদে বিবেচনা করা যায়।

খড়ের ডাঙ্গা বিলে সেই পানিকে পুরোপুরি সমস্যা হিসেবে না দেখে উৎপাদনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্ষায় জমিতে পানি থাকলে মাছ চাষ হচ্ছে। আবার পানি কমে এলে ধান চাষের সুযোগ থাকছে। ফলে একই জমি থেকে দুই মৌসুমে দুই ধরনের উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহুপ জানান, কৃষকদের উদ্যোগে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুমে কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পানি বেড়ে যায়, আবার পানি দীর্ঘসময় জমে থাকায় নিচু এলাকার কৃষিজমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে ধান চাষের সময় পিছিয়ে যেত এবং জমি প্রস্তুত করতেও সমস্যায় পড়তে হতো। এ কারণে জমির পানিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে মাছ চাষের পাশাপাশি পানি কমে গেলে ধান চাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় নিচু জমিতে সময়মতো ধান চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে জমির পানি নিয়ন্ত্রণ করে বর্ষায় মাছ চাষ এবং পানি কমে গেলে ধান চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলে থাকা গেটের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ধরে রাখা বা নিষ্কাশন করা হয়। এতে একই জমিতে মাছ ও ধান চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিলে একটি গেট রয়েছে। অতিরিক্ত পানি জমলে প্রয়োজন অনুযায়ী গেট খুলে পানি নিষ্কাশন করা যায়, আবার মাছ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানি থাকলে তা ধরে রাখা সম্ভব হয়। ফলে অতিবৃষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কিছুটা সামলে একই জমিতে মাছ ও ধান চাষ করা যাচ্ছে।

বর্তমান ঘের মালিক কামরুল গাজী জানান, প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে ৫৫ জন মালিকের জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৫২ জন মালিক মৎস্যচাষের জন্য জমি দিয়েছেন। জমির অবস্থান অনুযায়ী প্রতি বিঘা বছরে ৮ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হারি দেওয়া হয়। পাশাপাশি জমির মালিকেরা বছরে একবার ধান চাষের সুযোগ পান।

কামরুল গাজী বলেন, আগে এসব নিচু জমিতে বর্ষায় পানি জমে থাকায় বছরে মূলত একবার ধান চাষ করা যেত। দীর্ঘসময় জমি পানির নিচে থাকায় অন্য সময়ে জমি ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। এখন বর্ষায় সেই পানিকে কাজে লাগিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে এবং পানি কমে গেলে ধান চাষ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে ঘেরে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, মৃগেলসহ স্থানীয় জাতের সাদা মাছ চাষ করা হচ্ছে। এসব মাছের পোনা কলারোয়া উপজেলাসহ স্থানীয় ভাবে মাছের পোনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। আগে এক ফসলি জমি থেকে প্রতি বিঘায় বছরে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা আয় হতো। বর্তমানে মাছ ও ধান মিলিয়ে প্রতি বিঘায় বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা আয় হচ্ছে। এতে একই জমি থেকে সারা বছর উৎপাদন ও আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কৃষিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই জমির উচ্চতা, মাটির ধরন, লবণাক্ততা এবং কতদিন পানি থাকে এসব বিবেচনা করে ফসল ও জাত নির্বাচন করতে হবে।

তিনি বলেন, এক থেকে দুই মাস পানি থাকার পর পানি নেমে গেলে স্বল্পমেয়াদি ও স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী ধানের জাত চাষ করা যেতে পারে। দীর্ঘসময় জলমগ্ন জমিতে ব্রি ধান৭৯-এর মতো জলমগ্নতা সহনশীল জাত এবং লবণাক্ততার প্রভাব থাকলে উপযোগী লবণসহিষ্ণু জাত বেছে নেওয়া যেতে পারে। চার থেকে ছয় মাস বা তার বেশি সময় পানি থাকলে ধানের পরিবর্তে উপযোগী মাছ চাষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান চাষের মতো বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে।

শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট থাকলে সরিষা, ডাল, গম, ভুট্টা ও স্থানীয়ভাবে উপযোগী সবজির মতো তুলনামূলক কম পানিনির্ভর ফসল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে জাত বা ফসল নির্বাচনের আগে মাটি ও পানির অবস্থা পরীক্ষা করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কৃষকেরা জমির মাটি, লবণাক্ততা, ফসলের জাত, সার, রোগবালাই ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ফসলভিত্তিক পরামর্শের জন্য বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা বামিসের ওয়েবসাইটে তথ্য পাওয়া যায়: https://www.bamis.gov.bd/bn/

তিনি আরও বলেন, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে আগেই নালা-গেট সচল রাখা, ঘেরের পাড় মজবুত করা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা দরকার। আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে চাষাবাদের সিদ্ধান্তে যুক্ত করলে অতিবৃষ্টি ও খরার ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মৎস্যচাষেও প্রভাব ফেলছে। অতিবৃষ্টিতে ঘেরের পানি বেড়ে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার দীর্ঘ শুষ্ক সময়ে পানির গভীরতা কমে গেলে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানির গুণমানেও পরিবর্তন আসতে পারে।

তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় রেখে মৎস্যচাষিদের ঘেরের ভেড়ি শক্ত রাখা, পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের পথ সচল রাখা এবং পানির গভীরতা ও গুণমান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। অতিবৃষ্টির আগে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা এবং মাছের প্রজাতি ও পোনা মজুতের ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, কৈ মাছ চাষ করা জরুরি। মাছের খাদ্য প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও পানির গুণমান ব্যবস্থাপনায় মৎস্য বিভাগের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধ জমিতে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষের পাশাপাশি পানি কমে গেলে ধান চাষ করা গেলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এ ধরনের চাষাবাদে পানি নিয়ন্ত্রণ, আশপাশের কৃষিজমির স্বার্থ ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

মৎস্যচাষিরা মাছের রোগ, পানির গুণমান, পোনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ঘের পরিচালনা বিষয়ে উপজেলা মৎস্য অফিসে পরামর্শ নিতে পারেন। সরকারি কৃষি ও মৎস্য দপ্তরের পরামর্শ নিয়ে চাষের সময় নির্ধারণ করলে আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।

বিজ্ঞাপন