জলবায়ুর সঙ্গে লড়াই করে চন্দনার কৃষিবিপ্লব

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ণ
এম কামরুজ্জামান, শ্যামনগর ব্যুরো

“আমরা নিজেরা বিষ খাই না, অপরকেও বিষ খাওয়াতে চাই না। সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে উন্নয়ন সম্ভব।”

কথাগুলো বলছিলেন চন্দনা রানী। জলবায়ু সহনশীল কৃষিচর্চার মাধ্যমে প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি খামার গড়ে তুলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তিনি।

অদম্য সাহস ও উদ্যোগী শক্তির প্রতীক চন্দনা রানী (৩০)। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে। স্বামী রঞ্জন মন্ডল (৩৪) পেশায় দিনমজুর। ৩০ শতক জমির ওপর তাঁদের বসবাস। পরিবারে এক ছেলে সজীব মন্ডল (৯) ও এক মেয়ে ধৃতি মন্ডল (৩)। স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান এই চার সদস্যের পরিবার এখন নিজেদের উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

নারীরা নিজেদের সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেলে উন্নয়নের পথে ধাবিত হওয়া সম্ভব—চন্দনা রানী যেন তারই বাস্তব উদাহরণ। উপকূলীয় এলাকার এই নারী জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি খামার।

স্থানীয় প্রযুক্তি ও অভিযোজন চর্চার মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল কৃষিফসল চাষের পাশাপাশি নিজের বাড়িটিকেই জলবায়ু সহনশীল কৃষি শেখার কেন্দ্রে রূপ দিয়েছেন তিনি।

চন্দনা রানীর বাড়িতে কী নেই! রয়েছে স্থানীয় জাতের হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু, মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ, পুকুরে স্থানীয় প্রজাতির মাছ চাষ, অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও ঔষধি গাছের বাগান। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ বৃক্ষ।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নানা ধরনের অভিযোজন কৌশলও গ্রহণ করেছেন তিনি। এলাকার নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ছোট একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন মানবিক ও পরিবেশ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়।

চন্দনা রানীর কৃষিবাড়িতে পৌঁছালে প্রথম দর্শনেই যে কারও মন আনন্দে ভরে উঠবে। সারি সারি বস্তায় আদা চাষ, ক্যারেট বা ফেলে দেওয়া পাত্রে মরিচ চাষ, মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ, বেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ সবকিছুতেই রয়েছে তাঁর সৃজনশীলতার ছাপ।

স্থানীয় প্রজাতির চারা উৎপাদনের মাধ্যমে নার্সারি স্থাপন করেছেন তিনি। রয়েছে তিন স্তরবিশিষ্ট ফসল চাষের ব্যবস্থা। পুকুরে মাছ চাষ, পুকুরের ওপর মাচায় সবজি চাষ এবং পুকুরের পাড়ে ফলজ বৃক্ষএকই জায়গায় একাধিক সম্পদের সমন্বয়ে তৈরি করেছেন উৎপাদনের ব্যবস্থা।

চন্দনা রানী জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার করেন। এতে একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করছেন।

মাটির তৈরি হাজল ব্যবহার করে হাঁস ও মুরগির ডিম ফোটানোর কাজও করেন তিনি। নিজ উদ্যোগে সংগঠনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন দেশীয় বীজ ব্যাংক। এই বীজ ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়মিত বীজ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিনিময়ের কাজ করে চলেছেন।

তাঁর বাড়িতে গেলেই চোখে পড়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা। চন্দনা রানী নিজেই জৈব পদ্ধতি ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করেন। একই সঙ্গে অন্যদেরও পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কৃষিপদ্ধতি অনুসরণে অনুপ্রেরণা জোগান।

নিজের উৎপাদিত পণ্য নিজ এলাকার পাশাপাশি স্থানীয় সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করেন তিনি। তাঁর এই সামগ্রিক কাজে সহযোগিতা করেন দিনমজুর স্বামী রঞ্জন মন্ডল। পাশাপাশি নিজের বাড়িতে সেলাই মেশিনে কাজ করে বর্তমানে প্রতি মাসে মোটামুটি একটি আয় করছেন চন্দনা রানী।

এখন তিনি ভিন্ন ভিন্ন সম্পদ থেকে আয় করছেন। ফলে আগের তুলনায় অনেকটাই স্বচ্ছল চন্দনা রানীর পরিবার।

চন্দনা রানী বলেন, “এখন আমার পরিবারের সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। আমি এখন নিয়মিত সঞ্চয় জমা করছি। আমার স্বপ্ন হলো, আমি বসতঘরটি সুন্দর করব এবং সন্তান দুটিকে লেখাপড়া শেখাব।”

প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ চন্দনা রানীর কৃষি খামার উপকূলসহ বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষিঐতিহ্য, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি এবং স্থায়িত্বশীল জীবনযাত্রার দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ চন্দনা রানীর এই জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতি উপকূলীয় প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

উপকূলের এই তরুণ নারী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নিজের নানা ধরনের অভিযোজনচর্চার মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন উন্নয়নের এক রোল মডেল।

বিজ্ঞাপন