ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান, কাদাপথে স্কুলে যাতায়াত

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৯ অপরাহ্ণ
কালিগঞ্জ প্রতিনিধি

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ১০৩ নম্বর কালিগঞ্জ সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায় ১৬০ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নবঞ্চিত। জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান। এর সঙ্গে সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথ কাদাপানি ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও বছরের পর বছর বিদ্যালয়টি উন্নয়নবঞ্চিত। উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণ হলেও সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। ফলে বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

গত ২৭ আগস্ট দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক থেকে বিদ্যালয়ের ভেতরে যাওয়ার পথটি কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এ পথ দিয়ে চলাচল করতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাদা-পানি মাড়িয়েই বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ভালো শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক কক্ষ ও লাইব্রেরিরও সুব্যবস্থা নেই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার বলেন, ‘আমাদের জায়গা খুবই কম। চলাচলের পথের জন্য আলাদা জায়গা কোথায় পাব? কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা করতে গেলে তারা জায়গা দিতে চান না। তবে কোনো না কোনোভাবে চলাচলের পথের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এজন্য চেষ্টা করতে হবে।’

সহকারী শিক্ষক আরিজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের জমি মাত্র পাঁচ শতাংশ। এ কারণে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বারবার বাজেট এলেও তা ফিরে যায়।

সহকারী শিক্ষক হাসিব মেহেদী হাসান বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য কয়েকবার বাজেট এসেছিল। পরবর্তীতে সেগুলো বাতিল হয়ে গেছে। কী কারণে বাতিল হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির মধ্যে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের। তাদের প্রশ্ন, উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কি বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকবে?

একই বাউন্ডারির মধ্যে থাকা দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চলাচলের বিষয়টি সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। তাদের দাবি, দুই প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের একটি স্থায়ী বা কার্যকর ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এ বিষয়ে কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র বাঁচাড় বলেন, সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা খুবই সীমিত। তাদের স্কুলের পথ দিয়ে স্থায়ী চলাচলের রাস্তা করা হলে মাঠের জায়গা কমে যাবে। তাছাড়া তাদের একটি পুরোনো ভবন রয়েছে। সেটি বরাদ্দ হলে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ হতে পারে। এ কারণে স্থায়ী সড়ক করার জন্য জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করলে কোনো অসুবিধা হবে না। আপাতত মাঠের দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলাচল করলে তাদেরও কোনো আপত্তি নেই।

জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ১০৩ নম্বর কালিগঞ্জ সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করছেন বলেও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এতে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে সংকট। ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং যাতায়াতের পথ সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

কালিগঞ্জ উপজেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না। আমি জরুরি ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখব এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।’

এ বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, ‘কালিগঞ্জ সদরে এমন জরাজীর্ণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে এটি আমার জানা ছিল না। বিষয়টি এই প্রথম শুনলাম। আমি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করব। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন