মায়ের মৃত্যুর পর অনাহারে প্রতিবন্ধী আবুবকর, শেষ আশ্রয় বৃদ্ধা নানি

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ণ
HridoyBarta

জন্ম থেকেই শারীরিক ও বাকপ্রতিবন্ধী আবুবকর সিদ্দিক (২৫)। জন্মগত প্রতিবন্ধকতাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ। তাকে মেনে নিতে পারেননি বাবা আব্দুল বিশ্বাস। প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেওয়ার পর স্ত্রী হাসিনা খাতুনকে তালাক দিয়ে অন্যত্র চলে যান তিনি। এরপর থেকেই একমাত্র সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে বৃদ্ধা মা সোনাভান বিবিকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় হাসিনা খাতুনের কঠিন জীবনসংগ্রাম।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের বেড়বাড়ী গ্রামের সেই সংগ্রামী মা টানা ২৩ বছর মানুষের বাড়িতে, মাঠে ও ক্ষেতে-খামারে কাজ করে প্রতিবন্ধী ছেলে এবং বৃদ্ধা মায়ের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হলে অর্থাভাবে চিকিৎসার সুযোগ পাননি। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধকার নেমে আসে আবুবকর ও তার বৃদ্ধা নানির জীবনে।

বর্তমানে ভাঙা টালির ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই বসবাস তাদের। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ঘরে নেই প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, রান্নার হাঁড়ি-পাতিলও ভাঙাচোরা। দুই বেলা খাবার জোটানোই এখন তাদের সবচেয়ে বড় লড়াই। প্রতিবেশীরা কখনো-সখনো খাবার দিলে সেদিন খাওয়া হয়, না হলে অনাহার কিংবা অর্ধাহারেই কাটে দিন।

৭০ বছরের বেশি বয়সী সোনাভান বিবি নিজেই বয়সের ভারে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। তবুও নাতি আবুবকরের খাওয়ানো, গোসল করানোসহ সব কাজ তাকেই করতে হয়। কারণ আবুবকর নিজের ইচ্ছায় হাঁটতে, চলতে কিংবা কথাও বলতে পারেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোনাভান বিবি বলেন, “আমার মেয়িডা মরি যাবার পর থেকি আমরা মাঝে মদ্দি না খেয়ি থাকি। ছ্যামড়াডা প্রতিবন্ধী, নিজি থেকি কিছুই করতি পারে না। তার সব কাজই আমাকে করতি হয়। আমি আর কতদিন পারমু?”

স্থানীয়দের ভাষ্য, হাড্ডিসার আবুবকর কথা বলতে না পারলেও কেউ কাছে গেলে এক চিলতে মায়াবী হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকে। শান্ত স্বভাবের এই যুবক কখনো কারও কাছে হাত পাতেন না। ক্ষুধা, কষ্ট আর অসহায়ত্ব নীরবে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনিসুর রহমান আনিস জানান, আবুবকর সিদ্দিক প্রতিবন্ধী ভাতা এবং সোনাভান বিবি বয়স্ক ভাতা পান। তবে সেই সামান্য অর্থে তাদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হয় না।

স্থানীয়দের দাবি, মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত এই পরিবারটি চরম মানবিক সংকটে রয়েছে। তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য, চিকিৎসাসেবা এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

যে মা ২৩ বছর জীবনযুদ্ধ করে প্রতিবন্ধী সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, সেই মায়ের মৃত্যুর পর আজ অনাহার, অর্ধাহার আর বিনা চিকিৎসায় দিন কাটছে আবুবকর ও তার বৃদ্ধা নানির। সমাজের বিত্তবান, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতি তাদের একটাই আকুতি “আমাদের একটু বাঁচার মতো বাঁচতে দেন, আমরা বাঁচতে চাই।”

বিজ্ঞাপন