সাতক্ষীরায় টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে সাতক্ষীরা জেলা এখন কার্যত পানির নিচে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানেই জলাবদ্ধতা। রাস্তাঘাট, বাজার, ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। কাজ নেই, আয় নেই, অনেক পরিবারের ঘরে খাবারও নেই।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনে সাতক্ষীরায় ২৮০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। একটানা ভারী বর্ষণে জেলার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে জমে থাকা পানি নামার কোনো সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার পলাশপোল, কাটিয়া, ইটাগাছা, বকচরা ও খুলনা রোড এলাকার বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
শুধু শহর নয়, উপজেলার অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগরের নিচু এলাকা পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় আশাশুনি ও শ্যামনগরে জোয়ারের পানিতে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘের তলিয়ে গেছে।
সাতক্ষীরা সদরের ফয়জুল্যাপুর গ্রামের মাছচাষী মমিনুর রহমান বলেন, “তিন বিঘা জমিতে মাছের ঘের করেছিলাম। সব পানিতে ভেসে গেছে। বিলের মধ্যে অনেকের ঘেরই তলিয়ে গেছে।”
জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি মানবিক সংকটে পড়েছেন দরিদ্র পরিবারগুলো।
ধুলিহরের বেড়বাড়ী গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী সোনাভান বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কদিন ধুরি দলক মোটে থেমতি না। চুলু-টুলু সপ ভিজি গে। চালের পলিথিন ফুটু হুয়ি পানি পুড়ি ভেসি যেতি। আবার ঘরে নান্দার কিচ্ছু নেই। ওদিক পাগল ছ্যামড়াডা সারাদিন শুধু খাবো খাবো কুরতিছ। আমি ওর নে মলাম জে।”
টানা বৃষ্টিতে দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক ও নির্মাণশ্রমিকদের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আয় বন্ধ হলেও সংসারের প্রয়োজন থেমে নেই।
সাতক্ষীরা শহরের ভ্যানচালক আলী হোসেন বলেন, “চার দিন ধরে ঠিকমতো ভ্যান বের করতে পারিনি। ঘরে চাল নেই। বউ-বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে আছি।”
তালা উপজেলার গৃহপরিচারিকা রেহেনা বেগম বলেন, “যাদের বাসায় কাজ করতাম, তাদের বাড়িতেও পানি। তারাও কাজে ডাকছে না। ঘরের ভিতর হাঁটু পানি। রান্না করার উপায় নেই।”
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে উঁচু রাস্তা, স্কুল ও মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে। তবে সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার প্রায় ১২ হাজার হেক্টর আমন ধানের জমি পানিতে নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি সবজি ক্ষেতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, শত শত মৎস্য ঘেরের বাঁধ ভেঙে কোটি টাকার চিংড়ি ও মাছ ভেসে গেছে। এতে ঘের মালিকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
শ্যামনগরের ঘের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, “১৫ লাখ টাকা ঋণ করে ঘের করেছিলাম। এক রাতের জোয়ারে সব শেষ। এখন ব্যাংকের কিস্তি দেবো কীভাবে?”
টানা জলাবদ্ধতায় মশার উপদ্রবও বেড়েছে। একই সঙ্গে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, “বন্যা পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা সব উপজেলায় মেডিকেল টিম প্রস্তুত রেখেছি।”
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৪০ মেট্রিক টন চাল ও ৮ লাখ টাকা ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে পর্যায়ক্রমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নদীর বাঁধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। আর যেটুকু দেওয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
আশাশুনির দিনমজুর করিম গাজী বলেন, “চেয়ারম্যান-মেম্বার আসে, ছবি তোলে, নাম লেখে। কিন্তু চাল-ডাল কিছুই দেয় না। আমরা যাবো কোথায়?”
পরিবেশবিদদের মতে, খাল-বিল ভরাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সাতক্ষীরা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে খাল খনন, আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষীদের নগদ প্রণোদনা, স্থায়ী ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নদীর ভাঙনরোধে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার মানুষ এখন বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কিন্তু এরই মধ্যে হাজারো নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের দ্রুত মানবিক সহায়তা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
পানিবন্দি হাজারো পরিবার, ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, ফসল ও মাছের ঘের
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ অপরাহ্ণ
HridoyBarta







