কালিগঞ্জকে হারিয়ে ডিসি কাপের চ্যাম্পিয়ন আশাশুনি

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ণ
সাহাদাত হোসেন রাজ

টাইব্রেকারের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা দলকে ৫-৩ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আশাশুনি উপজেলা দল। নির্ধারিত সময়ের খেলায় দুই দল ১-১ গোলে সমতায় থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে আশাশুনি উপজেলা দল পাঁচটি শটের সবকটিতে গোল করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অপরদিকে কালিগঞ্জ উপজেলা দল তিনটি শটে গোল করতে সক্ষম হয়।

রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর জমজমাট ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ফাইনালে মুখোমুখি হয় আশাশুনি উপজেলা ও কালিগঞ্জ উপজেলা ফুটবল দল। খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ক্রীড়ামোদী দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি, উচ্ছ্বাস ও দুই দলের সমর্থকদের স্লোগানে পুরো স্টেডিয়াম পরিণত হয় প্রাণবন্ত ক্রীড়া উৎসবে।

খেলার শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে খেলতে থাকে। ম্যাচের ৯ মিনিটের মাথায় আশাশুনি উপজেলা দলের ৯ নম্বর জার্সিধারী সজীবের গোলে এগিয়ে যায় আশাশুনি। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে ওঠে কালিগঞ্জ উপজেলা দল। গোল হজমের পর খেলার কৌশলেও পরিবর্তন আনে তারা। শুরুতে ৪-৪-২ পজিশনে খেললেও পরে ৪-৩-২-১ পজিশনে আক্রমণের ধার বাড়ায় কালিগঞ্জ। অন্যদিকে লিড ধরে রেখে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আশাশুনি উপজেলা দল এবং ৪-২-২-২ পজিশনে খেলা চালিয়ে যায়।

প্রথমার্ধে আর কোনো গোল না হওয়ায় সজীবের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় আশাশুনি উপজেলা দল। মধ্যবিরতিতে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে ওঠে কালিগঞ্জ উপজেলা দল। একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। ম্যাচের ৫৫ মিনিটের মাথায় কালিগঞ্জ উপজেলা দলের ১১ নম্বর জার্সিধারী বিদেশি খেলোয়াড় ডি-বক্সের মধ্যে একা পেয়ে গেলে নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি হয়। তবে আশাশুনি উপজেলা দলের গোলরক্ষক জি কে শান্ত দুর্দান্ত দক্ষতায় সেই আক্রমণ প্রতিহত করে দলকে বিপদমুক্ত করেন। গোলরক্ষক শান্তর অসাধারণ সেভে এ যাত্রায় রক্ষা পায় আশাশুনি।

এরপরও গোলের জন্য আক্রমণ অব্যাহত রাখে কালিগঞ্জ। অবশেষে ম্যাচের ৮৫ মিনিটের মাথায় কালিগঞ্জ উপজেলা দলের ১০ নম্বর জার্সিধারী বিদেশি খেলোয়াড় আল আমিনের গোলে ১-১ সমতায় ফেরে কালিগঞ্জ। গোল পাওয়ার পর ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। খেলার ৮৮ মিনিটে আশাশুনি উপজেলা দলের সজীবের নেওয়া শট দক্ষতার সঙ্গে সেভ করেন কালিগঞ্জ উপজেলা দলের গোলরক্ষক নাঈম। এরপর নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয় ম্যাচ।

নির্ধারিত সময়ে কোনো দল জয়ী না হওয়ায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে টাইব্রেকারের সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। টাইব্রেকারে প্রথম শট নিতে আসেন আশাশুনি উপজেলা দলের বিদেশি খেলোয়াড় বেনজামা। তার শটে গোল পেয়ে এগিয়ে যায় আশাশুনি। এরপর কালিগঞ্জের হয়ে শট নিতে আসেন আল আমিন। কিন্তু তার নেওয়া শট দুর্দান্ত দক্ষতায় সেভ করেন আশাশুনি উপজেলা দলের গোলরক্ষক জি কে শান্ত। শান্তর ওই সেভের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামের দর্শকভর্তি গ্যালারি।

এরপর আশাশুনি উপজেলা দলের বাকি চারটি শটও সরাসরি গোলে পরিণত হয়। অন্যদিকে কালিগঞ্জ উপজেলা দল পরবর্তী তিনটি শটে গোল করলেও একটি শট থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়। ফলে টাইব্রেকারে আশাশুনি উপজেলা দল ৫-৩ গোলের ব্যবধানে জয় পেয়ে জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হয়। অপরদিকে কালিগঞ্জ উপজেলা দল রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

খেলা শেষে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক মিজ কাউসার আজিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোঃ আশরাফুল আলম, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দিন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমাতুল্লাহ পলাশ এবং জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ্ব আব্দুর রউফ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। খেলাধুলার জন্য সাতক্ষীরা উর্বর ভূমি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে সাতক্ষীরার সন্তানদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন কোনো খেলা ছিল না, খেলার পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনে উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে খেলাধুলার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী মোঃ মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মঈনুল ইসলাম মইন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবুল হাসেম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রিপন বিশ্বাস, জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাসান হাদী, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতী, সাবেক যুবদল নেতা নাসিম ফারুক খান মিঠু, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ইমদাদুল ইসলাম, সদস্য আবু নাসের মোঃ আবু সাঈদ, ফিফা রেফারি তৈয়ব হাসান বাবু, বিশিষ্ট সমাজসেবক আলহাজ্ব ডাঃ আবুল কালাম বাবলা এবং জেলা ক্রীড়া অফিসার মোঃ মাহবুবুর রহমান। এছাড়া সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফাইনাল ম্যাচে রেফারি হিসেবে মাঠ পরিচালনা করেন তরুণ প্রজন্মের অন্যতম আইকন আবু সুফিয়ান। সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাসির উদ্দীন ও জাহাঙ্গীর কবির। চতুর্থ রেফারি ছিলেন মিজানুর রহমান। ম্যাচ কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন আতাউর রহমান। মাঠে ধারা বিবরণীতে ছিলেন ওলিউর রহমান, ইসমাইল হোসেন মিলন ও আশরাফ হোসেন।

উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এবারের জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সমতা, এরপর টাইব্রেকারের টানটান উত্তেজনার মধ্যে সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামের দর্শকদের জন্য ম্যাচটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের রোমাঞ্চে কালিগঞ্জকে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের ঘরে তোলে আশাশুনি উপজেলা দল।

বিজ্ঞাপন