সাতক্ষীরায় জলবায়ুর প্রভাব, আনারকলির সাফল্যের হাতছানি

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ণ
আলী মুক্তাদা হৃদয়

সবুজ লতায় ঝুলছে হলুদ রঙের ফল। দূর থেকে দেখলে অনেকটা পরিচিত কোনো ফল মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায় এটি প্যাশন ফ্রুট যা স্থানীয় ভাষায় আনারকলি নামে বেশি পরিচিত। সাতক্ষীরার কলারোয়ার ইলিশপুরে প্রামের কৃষকের বাগানে এমন দৃশ্যই এখন কৌতূহল তৈরি করছে। এলাকার কৃষকদের কাছে এত দিন অপরিচিত এই বিদেশি ফল চাষ করে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন কৃষক মো. গফফার হোসেন।

কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের ইলিশপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে প্যাশন ফ্রুটের এই প্রদর্শনী বাগান। কৃষি সম্পপ্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি-রেইনস)-এর আওতায় এবং উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছে।

সাতক্ষীরার উপকৃলীয় অঞ্চলের বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সঙ্গে কৃষিকে মানিয়ে নেওয়ারও একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন কৃষি বিভাগ। কারণ, সাতক্ষীরার কৃষি এখন নানা ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মুখে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, তাপমাত্রার পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে।

বিশেষ করে উপকৃলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একই ধরনের ফসলের ওপর নির্ভরতা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনা এবং বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন নতুন ফসল নিয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ইলিশপুরের গফফার হোসেনের প্যাশন ফ্রুট বাগান প্রদর্শনী হিসেবে তৈরী করেছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফ্রুট উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। তবে অতিরিক্ত পানি জমে থাকা এ ফলের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে জমিতে ভালো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা জররুরি। দো-আঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি এ ফল চাষের জন্য উপযোগী। অর্থাৎ শুধু আবহাওয়া অনুকৃল হলেই হবে না, জমি ও পানির অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।

কৃষক গফফার হোসেন বলেন, ‘এ ফল আগে আমাদের এলাকায় খুব একটা দেখিনি। কৃষি অফিসের পরামর্শে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুররু করেছি। ফল দেখতে সুন্দর এবং খেতেও বেশ সুস্বাদু। ভেতরের রসালো অংশ টক-মিষ্টি স্বাদের। এই গাছের চারা এখন সাতক্ষীরার বিভিন্ন নার্সরীতে পাওয়া যায়। আকার ভেদে ১৫০ টাকা থেকে শুররু করে ৪০০ টাকা দামে একেকটি চারা পাওয়া যায়। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে চাষ বাড়ানোর ইচ্ছা আছে।’

গফফার হোসেন বলেন, ‘প্যাশন ফ্রুটের বাজার বাংলাদেশে এখনো পপ্রচলিত ফলের মতো বড় নয়। তবে শহরাঞ্চলে ফলের দোকান, সুপারশপ, রেস্তোরাঁ, জুস ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে এ ফলের ব্যবহার রয়েছে। ফলটি সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, জ্যাম, জেলি, আইসক্রিম ও বিভিন্ন পানীয় তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়। ফলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বাজারও সম্পপ্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে প্যাশন ফ্রুট চাষের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

গফফার হোসেন আরও জানান, ‘প্যাশন ফ্রুট চাষের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাও গুররুত্বপৃর্ণ। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনার ফলের বাজার, বড় শহরের পাইকারি বাজার, সুপারশপ এবং ফল পপ্রক্রিয়াজাতকারী পপ্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বড় পরিসরে চাষের আগে এই ফলের চাহিদা নির্ধারণ করে বিনিয়োগ করা নিরাপদ।’

চন্দনপুর ইউনিয়নের কৃষক সোহেল রানা বলেন, ‘নতুন কোনো ফসল চাষ করতে হলে আগে জানতে হয় জমি ও আবহাওয়া সেটার জন্য কতটা উপযোগী। এই বাগান দেখে প্যাশন ফ্রুট সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কৃষি অফিস যদি ভালো চারা সংগ্রহ, চাষ পদ্ধতি ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে সহযোগিতা করে, তাহলে অন্য কৃষকরাও এই ফল চাষে আগ্রহী হতে পারেন।’

পুষ্টির দিক থেকেও প্যাশন ফ্রুটের গুরুত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছাঃ নাসরিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘প্যাশন ফ্রুটে ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলে অপ্রচলিত এ ফলের চাষ বাড়লে মানুষের খাদ্যতালিকায় নতুন একটি পুষ্টিকর ফল যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

তবে নতুন ফল দেখে উৎসাহিত হয়ে কৃষকদের সরাসরি বড় জমিতে চাষ শুররু না করার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। রোগমুক্ত চারা সংগ্রহ, জমির উপযোগিতা যাচাই, মাচা তৈরি, পানি নিষ্কাশন, সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ পপ্রতিটি বিষয়েই সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

কলারোয়া উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘প্যাশন ফ্রুট পুষ্টি গুণসম্পন্ন একটি ফল। এ ফল চাষে কৃষকদের আগপ্রহ তৈরি হচ্ছে। তবে চাষের আগে জমির উপযোগিতা এবং পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি দেখতে হবে। রোগমুক্ত চারা সংগপ্রহ ও সঠিক পরিচর্যাও খুব গুররুত্বপৃর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘কৃষকরা প্রথমে ছোট পরিসরে চাষ করে অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। ফলন ও বাজার সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর চাষের পরিমাণ বাড়ানো ভালো। কোনো রোগ বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে নিজের মতো করে ঔষধ ব্যবহার না করে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।’

সাতক্ষীরা কৃষি সম্পপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকদের ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। তবে নতুন ফসল চাষের আগে জমির উপযোগিতা, উৎপাদন খরচ ও বাজার সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জররুরি।’

তিনি বলেন, ‘প্যাশন ফ্রুট চাষে আগ্রহী কৃষকদের প্রথমেই উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। মাটি ও পানির অবস্থা, জমিতে জলাবদ্ধতা হয় কি না এবং চাষের উপযোগিতা সম্পর্কে কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিতে পারবেন। বিশ্বস্ত উৎস থেকে রোগমুক্ত চারা সংগপ্রহ করতে হবে। মাচা, সার, সেচ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনাও সঠিকভাবে করতে হবে।”

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কোনো একটি বাগানে ভালো ফলন হয়েছে দেখেই বড় পরিসরে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না। আগে ছোট পরিসরে চাষ করে ফলন, খরচ ও বাজারদর সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে হবে। কৃষকের জন্য লাভজনক ফসল নির্বাচন করতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি বিক্রির সুযোগ ও বাজারদরও বিবেচনা করতে হবে।’

বিজ্ঞাপন