সাতক্ষীরা

লেবানন থেকে ফিরল দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধার নিথর দেহ

  নিজস্ব প্রতিনিধি ৭ জুন ২০২৬ , ৩:০৬:০৮ অনলাইন সংস্করণ

বুকভরা আশা আর পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে মাত্র এক মাস আগে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মম বাস্তবতায় প্রাণ হারিয়ে দীর্ঘ ২৭ দিন পর তিনি ফিরলেন নিজ গ্রামে—তবে জীবিত নয়, নিথর মরদেহ হয়ে। একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে আশাশুনির তরুণ নাহিদুল ইসলাম নাহিদকেও।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত এই দুই প্রবাসীর মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছালে শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদেশে যাওয়া দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধাকে হারিয়ে তাদের পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আকস্মিক এই শোক সহ্য করতে না পেরে তাঁর বৃদ্ধ বাবা আফসার আলী প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ছেলের মরদেহের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বলতে থাকেন, “কয় রে শফিকুল, সবাইকে জায়গা দেয়। দেখ কত মানুষ আসছে। ওভাবে শুয়ে থাকলে হবে? উঠো, এই গরমে সবার যেন কষ্ট না হয়।”

বৃদ্ধ পিতার এমন আকুতিতে উপস্থিত প্রতিবেশীরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

অন্যদিকে দুই কন্যাসন্তানকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন শফিকুলের স্ত্রী। স্বামীর মরদেহের উদ্দেশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “দেখো তোমার বাড়িতে কত মানুষ! তুমি যখন বেঁচে ছিলে আমি কোথাও যাইনি। আজকে তুমি নেই, তোমাকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসতে কত বড় বড় মন্ত্রী-এমপিরা ছিল। তুমি আমাদের কোথায় রেখে গেলে? এই মেয়ে দুটোকে আমি কীভাবে বড় করব? কী স্বপ্ন ছিল তোমার?”

বাবার মরদেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল তাদের দুই নাবালিকা কন্যা।

সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুল যখন লেবাননে যায়, তখন সে ছিল খুবই হাসিখুশি ও সদালাপী একজন মানুষ। সেখানে যাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় তার মৃত্যুর খবর আমরা পাই। অত্যন্ত দুঃখের মধ্যেও স্বস্তির বিষয় হলো, আমরা তার মরদেহ দেশে ফেরত পেয়েছি। দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করায় আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ।”

তিনি আরও বলেন, “শফিকুলই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঋণ-দেনা করে অনেক আশা নিয়ে সে বিদেশে গিয়েছিল। বর্তমানে তার বৃদ্ধ মা ও দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বড় মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ে এবং অত্যন্ত মেধাবী। পরিবারের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ওই মেয়ের জন্য একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে খুলনা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান বলেন, “লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী নাহিদুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলামের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে জরুরি খরচ ও দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার কারণে তাদের পরিবার পরবর্তীতে মোট ১৩ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা পাবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবন বীমা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, ক্লিয়ারেন্স ও ফ্লাইটের ওপর নির্ভর করে লেবাননে নিহত কলারোয়া উপজেলার আরেক প্রবাসী শুভ কুমার দাসের মরদেহও দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

খালেদুর রহমান বলেন, “এই সুবিধা শুধু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, বরং দেশের সব প্রবাসী কর্মীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারির পর যারা বৈধভাবে বিদেশে গেছেন, তাদের পরিবার ১৩ লাখ টাকার পুরো সুবিধা পাবেন। তবে এর আগে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের পরিবার জীবন বীমার ১০ লাখ টাকা পাবেন না; তারা শুধু সরকারের ৩ লাখ টাকার অনুদান পাবেন। কারণ সে সময় জীবন বীমা কর্পোরেশনের এই বিশেষ সুবিধা চালু ছিল না।”

এদিকে আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি দাখিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে নাহিদুল ইসলাম নাহিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আল হাদিস জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল মালেক গাজী জানাজায় ইমামতি করেন।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ লেবাননের জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৮) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (২০)। তাদের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আরও খবর