আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৮ জুলাই ২০২৬ , ৪:৩৯:১৮ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন কিংবা লবণাক্ততার আগ্রাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বদলে দেয় তাদের জীবনের হিসাব-নিকাশ। দুর্যোগ শুধু ঘরবাড়ি বা জীবিকাই কেড়ে নেয় না, অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয় শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎও। আর এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে দেখা যায় কিশোরীদের। সংসারের আর্থিক চাপ কমাতে অনেক পরিবার বাল্য বিয়েকেই সহজ সমাধান হিসেবে ভাবলেও সাতক্ষীরার কয়েকটি পরিবার দেখিয়েছে ভিন্ন পথ। দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় বসবাস করেও তারা অল্পবয়সে মেয়ের বিয়ে না দিয়ে বেছে নিয়েছে শিক্ষার পথ। আর্থিকভাবেও এই মেয়েদের কেউ কেউ সহায়তা করছে পরিবারকে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের দিনমজুর আব্দুল কাদেরের পরিবার ৬ বছর আগে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। টিনের ঘর বিধ্বস্ত হয়, লোনা পানিতে তলিয়ে যায় চিংড়িঘের, কয়েক মাস ধরে প্রায় কোনো আয় ছিল না। এমন সময় আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকেই পরামর্শ দেন, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে অন্তত একটি দায়িত্ব কমবে। কিন্তু আব্দুল কাদের সেই পরামর্শ মানেননি।
তিনি বলেন, “আমার নিজেরও তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল। অনেক সময় মনে হয়েছে, হয়তো সবাই ঠিকই বলছে। কিন্তু পরে ভাবলাম, ঘর আবার বানানো যাবে, কাজও একদিন হবে। কিন্তু মেয়ের জীবন যদি একবার নষ্ট হয়ে যায়, সেটা আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না।”তার সেই সিদ্ধান্তের কারনে আজ তাঁর মেয়ে স্থানীয় একটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। পাশাপাশি একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ডিজিটাল মার্কেটিং শিখছেন। অনলাইনে কাজ করে নিজের শিক্ষার ব্যয়ের একটি অংশও বহন করছেন সে।
মেয়ের মা রহিমা বেগম বলেন, “আমি নিজের জীবনে বুঝেছি, অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েদের কত স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। তাই যত কষ্টই হোক, ওর পড়াশোনা বন্ধ করিনি।”
মেয়েটি এই প্রতিবেদককে বলেন, “অনেকে বলেছিল মেয়েদের এত পড়াশোনা করে লাভ নেই। কিন্তু এখন আমি নিজেই আয় করতে পারি। ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করতে চাই।”
বাংলাদেশে যে কয়টি জেলায় বাল্যবিবাহের হার সর্বাধিক তার মধ্যে সাতক্ষীরা অন্যতম। এর মাঝেও তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের এক কিশোরীর বাল্যবিয়ে না ঠেকানো গেলে সপ্তম শ্রেণিতেই তার লেখাপড়া শেষ হয়ে যেতে পারতো । আর্থিক সংকটের কারনে সেসময় তার বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। তবে নিজের দৃঢ়তা ও পরিবারের অন্য সচেতন সদস্যদের বাধার কারনে সে সময় বিয়েটা ঠেকানো যায়।
বর্তমানে মেয়েটি একটি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। আজ সে নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে আয় করে নিজের খরচ ও পরিবারকে সহায়তা করছে।
নিজ বাড়িতে সকাল ও বিকালের পৃথক ব্যাচে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থীকে সে পড়াচ্ছে। তার বিশ্বাস, যে শিক্ষা তাকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করেছে, সেই শিক্ষাই ভবিষ্যতে আরও অনেক কিশোরীকে নিজের স্বপ্ন পূরণের সাহস জোগাবে।
স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা সমাজকর্মীদের মতে, দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থের অভাব নয়, তথ্যের অভাবও। অনেক পরিবার জানেই না যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। ফলে তারা দ্রুত বাল্যবিয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
উপকূলীয় অঞ্চলে মেয়েরা ১৫ বা ১৬ বছরে পৌঁছালেই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হয়। বিশেষ করে দুর্যোগের পর আয় কমে গেলে এসব সামাজিক চাপ অনেক পরিবারকে বাল্যবিয়ের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তবে যেসব পরিবার এই চাপ উপেক্ষা করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা বলছে শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি লাভজনক।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ এর প্রোগ্রাম অফিসার, গাজী মাহিদা মিজান বলেন, দুর্যোগ কখনো বাল্যবিয়ের কারণ হতে পারে না। মূল কারণ দারিদ্র্য, তথ্যের অভাব ও সামাজিক মানসিকতা। পরিবার যদি বিকল্প আয়ের পথ এবং সরকারি সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে তারা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, একটি মেয়ে যত বেশি সময় বিদ্যালয়ে থাকবে, তার বাল্যবিয়ের ঝুঁকি তত কমবে। শিক্ষা শুধু বই শেখায় না, আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং পরিবারকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমুন নাহার বলেন, যেসব মায়েরা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়ে আয় করতে শুরু করেন, তারা সাধারণত মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতে চান না। কারণ তখন তারা বুঝতে পারেন, মেয়ের শিক্ষা একটি বিনিয়োগ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। পরিবার, বিদ্যালয়, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর কবিরের মতে, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। সহশিক্ষা কার্যক্রম, কিশোরী ক্লাব এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরিবারগুলো উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জীবনদক্ষতা ও আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি ও উপবৃত্তি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের বিকল্প জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। বাল্যবিবাহের আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, থানা কিংবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানিয়ে দ্রæত আইনগত সহায়তা নেওয়া সম্ভব।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্তের মতে, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বাল্যবিবাহ কমাতে কিশোরীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, ইউনিয়ন পর্যায়ে কিশোরী ক্লাব ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিকে আরও সক্রিয় করা এবং সরকারি সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্য সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা গেলে দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের মধ্যেও বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ হয়তো পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে একটি মেয়ের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব। কারণ একটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা মানে শুধু একটি বিয়ে ঠেকানো নয়, বরং একটি জীবন, একটি পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।











