সাতক্ষীরা

লবণাক্ত উপকূলের আত্মা

  আলী মুক্তাদা হৃদয় ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৫:০০:২৮ অনলাইন সংস্করণ

জলবায়ুতে বিলীন সংস্কৃতি ঐতিহ্য

সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা। এখানে জীবন সবসময়ই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। নদী, নদীমুখ, খালবিল আর বঙ্গোপসাগরের সংস্পর্শে থাকা মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি এক সুতোয় বেঁধে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব শুধু জমি, ঘরবাড়ি বা জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে না, এটি ধ্বংস করছে মানুষের শেকড়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান। ভেঙে পড়ছে শতকের পুরোনো সামাজিক বন্ধন। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে, নারী ও বৃদ্ধদের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে, সমাজের বন্ধন শক্ত রাখার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষতি রোধের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস (৬০) বলেন, “আমার ভিটে বাড়ী নদীতে ভেসে গেছে। যে জমিতে প্রতি বছর চড়ক পূজা হতো, সেই জমি এখন নদীর সঙ্গে মিশে গেছে। আমরা শুধু ঘর হারাইনি, হারিয়েছি আমাদের স্মৃতি ও সংস্কৃতিও।”

উপকূলীয় জীবন ও সংস্কৃতি
উপকূলীয় মানুষজনের জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই যেমন নিত্যদিনের ঘটনা, তেমনি উৎসব-অনুষ্ঠানও ছিল তাদের মানসিক শক্তির উৎস। বর্ষবরণ, চড়ক পূজা, দোলযাত্রা, পালাগান, যাত্রাপালা, বিয়ের গান, গ্রামীণ মেলা এসবই ছিল গ্রামের সামাজিক মিলনমেলা।
প্রতি বছর বর্ষার পর গ্রামে সবাই মিলে আয়োজন করত। নারী ও পুরুষ, শিশুরা, বৃদ্ধ সকলেই মিলিত হতো। এই মিলনমেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের বন্ধন শক্তিশালী করার হাতিয়ারও ছিল।
কিন্তু ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, লবণাক্ততার কারণে জমি অনুর্বর হয়ে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান বাস্তুচ্যুতির ফলে এসব আয়োজন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

শুধু উপকূল নয় সাতক্ষীরা শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা আগের মতো আর জমকালো ভাবে উদযাপন হয় না।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে স্থানীয় গ্রাম ও পাড়া মহল্লায় বার্ষিক উৎসব বা সামাজিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হতো। এর মধ্যে প্রধান ছিল: চড়ক পূজা, দোলযাত্রা, পালাগান, গ্রামীণ মেলা ইত্যাদি। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে কৃষক ও গ্রামীণ মানুষ আনন্দ ও ধানচাষের সফলতার জন্য আয়োজন করতেন। গান, নাচ, হাডুডু ও স্থানীয় খাবারের আয়োজন থাকত। শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, সমাজের সকল বয়সের মানুষ একত্র হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব, যা গ্রামীণ ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচারকে তুলে ধরে। মন্দিরে প্রার্থনা, গান ও নাচ-নাট্য, স্থানীয় হস্তশিল্পের প্রদর্শনী সবই মিলিত হতো। গ্রামীণ লোকগান ও কাহিনিকেন্দ্রিক নাটক, যা মূলত গ্রামের ইতিহাস, নৈতিক শিক্ষা ও গল্পকে সমৃদ্ধ করত। এটি শিশু ও যুবক প্রজন্মকে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাত। একধরনের সামাজিক মিলন, যেখানে লোকজন পণ্য বিক্রি, বিনোদন, খেলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিত। এটি গ্রামের মানুষকে একত্রিত করে সামাজিক বন্ধন শক্ত করে।

বন্ধ হওয়ার কারণ
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান ও লোকসংস্কৃতি ছিল মানুষের জীবন ও মানসিক শক্তির অবলম্বন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এসব ঐতিহ্যকে ক্রমেই বিলীন করে দিচ্ছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে গ্রামীণ মেলা, চড়ক পূজা কিংবা দোলযাত্রার মতো উৎসবের জন্য নির্দিষ্ট স্থানগুলো ভেসে যাচ্ছে। একসময় যে জমিতে মানুষ একত্র হয়ে গান, নাচ, হাডুডু কিংবা নাটকের আসর বসাত, তা এখন নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে।
এছাড়া লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ায় কৃষকদের আয় কমে গেছে, ফলে উৎসব আয়োজনের সামর্থ্যও হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, বাস্তুচ্যুতির চাপ মানুষের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করেছে। নদীভাঙন ও ঝড়ের পর বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহর কিংবা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে আর মিলিত হচ্ছে না গ্রামের মানুষ, হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক সমাবেশের সুযোগ।
শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, জীবিকার টানাপোড়েনও সংস্কৃতিকে আঘাত করছে। আগে যেখানে উৎসব ছিল আনন্দ ও ঐক্যের প্রতীক, আজ সেখানে অনিশ্চয়তা ও দুঃখ জায়গা করে নিয়েছে। ফলে শত বছরের সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম দূরে সরে যাচ্ছে নিজেদের শেকড় থেকে। জলবায়ুর এই কঠিন বাস্তবতায় হারিয়ে যাচ্ছে উপকূলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির রঙিন অধ্যায়।

লোকসংগীত ও মৌখিক ঐতিহ্য
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে লোকসংগীত ও মৌখিক ঐতিহ্য একসময় ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ। ভাটিয়ালি, বাউল, কবিগান, ভাদুড়ি, পালাগান কিংবা গল্পগাথা এসব গান ও কাহিনি শুধু বিনোদনই দিত না, বরং নৈতিক শিক্ষা, ইতিহাস আর সামাজিক মূল্যবোধও প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দিত। সন্ধ্যায় উঠোনে কিংবা গ্রামীণ মেলায় এসব গান হতো মানুষের মিলনমেলা। কিন্তু নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে হারিয়ে যাচ্ছে সেই আসর। নতুন প্রজন্ম মোবাইল ও টেলিভিশনের কৃত্রিম বিনোদনে ঝুঁকে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও কাহিনি আর তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
নাট্য ব্যাক্তিত্ব শামীম পারভেজ বলেন, “লোকসংগীত হারিয়ে যাওয়া মানে মানুষের আত্মপরিচয় ক্ষয়ে যাওয়া। আগে কবিগান বা পালাগান শুধু বিনোদন দিত না, বরং আমাদের ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান, ভালোবাসা ও সংগ্রামের গল্প শোনাত। এখন এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হলে সমাজ ভাঙনের দিকে যায়। তাই সংস্কৃতি বাঁচানো মানেই মানুষকে বাঁচানো।”

ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও বিনোদন হারানো
হাডুডু, কাবাডি, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, দড়ি টানা, গোল্লাছুট, বৌচি কিংবা দড়ি লাফÍএসব খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং গ্রামীণ মানুষের সামাজিক বন্ধন, শারীরিক সুস্থতা ও ঐক্যের প্রতীকও ছিল। ঈদ, পূজা বা মেলার মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব খেলাধুলা হতো ব্যাপক উৎসাহ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে। মাঠের চারপাশে নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই জমে যেত উৎসবমুখর পরিবেশে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির ফলে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। গ্রামের খেলার মাঠগুলো ভেঙে নদীতে মিশে গেছে অথবা লবণাক্ত পানিতে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাস্তুচ্যুতির কারণে গ্রামের মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়, ফলে আগের মতো একত্র হয়ে খেলাধুলার আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে শিশুরা মোবাইল ও টিভিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যার ফলে তাদের আগ্রহও কমে গেছে।

শ্যামনগরের পদ্মপুকুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ খেলোয়াড় আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “আমাদের সময়ে হাডুডু খেলাই ছিল গ্রামের প্রাণ। ঈদের পর সবাই মাঠে ভিড় করত। এখন সেই মাঠ নদীতে হারিয়ে গেছে, খেলা আর হয় না। শিশুরা জানেই না হাডুডু কীভাবে খেলা হয়।”
আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকার তরুণ রফিকুল ইসলাম জানান, “আমাদের বাবা-চাচারা বলতেন নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ আনন্দের বড় উৎসব। কিন্তু এখন খালের পানি শুকিয়ে গেছে, নৌকাও নেই। ফলে আমরা শুধু গল্পই শুনতে পাই, দেখতে পারি না।”
এইসব ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু বিনোদনের সুযোগ হারানো নয়, বরং সমাজের সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া। খেলাধুলা মানুষকে একত্র করত, প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখত। আজ সেই সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে জলবায়ুর অভিঘাতে, আর নতুন প্রজন্ম দূরে সরে যাচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে।
আশাশুনি এলাকার বাসিন্দা মোঃ আবু হাসান বলেন, “আমরা আগে প্রতি বছর ঈদের পরের দিন গ্রামে নাচ-গান, হাডুডু প্রতিযোগিতা করতাম। এখন সে জায়গাটাই নেই, সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। তাই উৎসবও নেই।”

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে হাজারো পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করে। অনেকে গ্রাম হারিয়ে শহরে চলে আসেন। ২০১৩ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ও ২০২০ সালের ‘আম্পান’ আরও ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়েছে।
শ্যামনগর বুড়িগোয়ালিনী এলাকার গোপাল বিশ্বাস বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে প্রতি বছর চড়ক পূজা করতাম, গ্রামের সবাই মিলত, গান-বাজনা হতো, আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে যেত। এখন সেই স্থান নদীর সঙ্গে মিলেছে। শুধু ঘরবাড়ি নয়, আমাদের স্মৃতি, আনন্দ আর সংস্কৃতিই হারিয়ে গেছে। প্রতিটি বর্ষার সঙ্গে আমাদের আনন্দও হারিয়ে যাচ্ছে।”

পদ্মপুকুর গ্রাম রহিমা বেগম জানান, “ঈদের পর গ্রামের মাঠে হাডুডু খেলা হতো, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দে ভরে যেত। মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিষ্টি ভাগাভাগি করত, গল্প করত। কিন্তু এখন গ্রাম ছড়িয়ে গেছে, কেউ খেলা দেখে না, উৎসবও আর হয় না। মন খালি লাগে, মনে হয় আমাদের জীবনকেই নদী ভেঙে নিয়ে গেছে।”

আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকার হরেকৃষ্ণ দাস জানান, “আমাদের গ্রামে শত বছরের পুরোনো একটি মন্দির ছিল। সেই মন্দির শুধু প্রার্থনার জায়গা নয়, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেটি নদীতে ভেসে গেছে। নতুন করে আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এখন আমাদের শিশু-কিশোররা জানতে পারবে না, এই গ্রামে একসময় উৎসব কেমন হতো, গান-বাজনার পরিবেশ কেমন ছিল।”

সাতক্ষীরা শহরের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “গ্রামে সবাই একত্র হতো, উৎসবের সময় সকলের মুখে হাসি হতো। এখন শহরে এসে দেখি পাশের মানুষকেও চিনি না। শিশুদের খেলা, হাডুডু, কবিগানসব বন্ধ। উৎসব একাকী হয়, আনন্দ ভাগাভাগি যায় না। সমাজের বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে হারাচ্ছি আর তা বুঝতেও পারছি না।”

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড বসবাসরত মোঃ আব্দুস সেলিম বলেন, “আমার গ্রামে প্রতি বছর ঈদে সবাই একত্র হতো। এখন এখানে এসে দেখি পাশের মানুষকেও চিনি না। উৎসবও একাকী লাগে।” সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে গ্রামীণ সমাজের বন্ধন দুর্বল করছে।

শিশু ও কিশোর প্রজন্মের প্রভাব
গ্রামীণ উৎসব ও খেলা শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করত। এখন তারা শহরের আধুনিক বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে। আশাশুনির এক স্কুলশিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, “আগে বর্ষাকালে নাটক, পালাগান, কবিগান হতো। শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতা বাড়ত। এখন এসব নেই, ফলে তারা তাদের শেকড় চিনতে পারছে না। এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি; ফলে ভবিষ্যতের সমাজও ঐতিহ্যগত বন্ধন হারাতে পারে।”
নারীদের জন্য সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল একধরনের সামাজিক মুক্তি। এখন সেই সুযোগ নেই। ফলে নারীরা একাকী ও মানসিক চাপের মধ্যে আছে। শিশুরাও তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা, মেলা ও বিনোদন হারিয়ে পড়ছে আধুনিক কৃত্রিম বিনোদনের দিকে।

সংস্কৃতি সংরক্ষণের করণীয়
কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব মন্ময় মনির জানান, “সংস্কৃতি জাতির আত্মাসরূপ। সংস্কৃতি হারানো মানে শুধু অনুষ্ঠান হারানো নয়, মানুষের আত্মপরিচয় হারানো। গ্রামীণ গান, নাটক, মেলা, দোলযাত্রা এসব হারিয়ে গেলে সমাজও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিশু ও তরুণরা তাদের শেকড়কে চেনে না, নারীরা সামাজিক মুক্তি হারাচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব শুধু পুনর্বাসন নয়, হারানো ঐতিহ্য বাঁচানোও।”
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন জন্য কয়েককটি পরামর্শ দিয়েছেন কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব মন্ময় মনির তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী উৎসব পুনঃস্থাপনের জন্য বাস্তুচ্যুত হলেও উৎসব, মেলা ও পালাগান নতুন জায়গায় আয়োজন করা।
বাস্তুচ্যুত হলেও উৎসবের পুনঃস্থাপন : গ্রাম হারালেও নতুন জায়গায় চড়ক পূজা, দোলযাত্রা, মেলা বা হাডুডুর মতো উৎসব আয়োজন করা।
লোকসংগীত ও নাটকের ডকুমেন্টেশন : বয়স্কদের কাছ থেকে গান, কবিগান, পালাগান, গল্প সংগ্রহ করে ভিডিও, অডিও বা বই আকারে সংরক্ষণ।
বিদ্যালয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির পাঠ অন্তর্ভুক্ত : শিশুদের স্কুলে স্থানীয় খেলা, গান, গল্প ও আচার-অনুষ্ঠান শেখানো। শহর পর্যায়ে সাংস্কৃতিক চর্চা বেগবান করা।
সাংস্কৃতিক কর্মশালা আয়োজন : তরুণদের জন্য নাটক, গান, নাচ ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
বার্ষিক উপকূলীয় সংস্কৃতি উৎসব : বিভিন্ন স্থানে একত্র হয়ে স্থানীয় খেলা, গান, হস্তশিল্প প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা : উৎসব ও কর্মশালায় নারীদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা, যেন তারা সামাজিক বন্ধন পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।
ডিজিটাল সংরক্ষণ: হারানো সংস্কৃতিকে অনলাইনে ডকুমেন্টেশন করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সহজে শিখতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ : সাংস্কৃতিক সংরক্ষণকে পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাংস্কৃতিক ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, মানবিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মানসিক চাপ, হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এসব ঘটছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সাতক্ষীরার মানুষ শুধু জমি, ফসল বা ঘর হারাচ্ছে না, হারাচ্ছে তাদের আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক শেকড়। ঘর ভেঙে গেলে নতুন ঘর বানানো যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি আর ফিরে পাওয়া যায় না।
আজকের শিশুরা হয়তো আর জানবে না গ্রামে কেমন করে চড়ক পূজা হতো, ঈদের দিন সবাই কিভাবে একত্র হতো। তাই শুধু অর্থনীতি নয়, সাংস্কৃতিক দিকটিও সমান গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।

আরও খবর