তালা

মুসলিমা খাতুন: গৃহিণী থেকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাবলম্বী মাছচাষি

  তালা প্রতিনিধি ১৭ নভেম্বর ২০২৫ , ১:৫০:০৬ অনলাইন সংস্করণ

খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মুসলিমা খাতুন—একসময় সংসারের অভাব-অনটনে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। স্বামী ছিলেন প্রান্তিক জেলে ও সনাতনী পদ্ধতির ক্ষুদ্র মাছচাষি। নিয়মিত আয় না থাকায় সংসার চালানো ছিল কষ্টকর। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ছুটে যেতে হতো ঘের দেখাশোনায়ও। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি না জানায় উৎপাদন হতো সামান্য, আর লাভ তো আরও কম।

তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাস) বাস্তবায়িত এবং পিকেএসএফ, ইফাদ ও ড্যানিডার সহযোগিতায় পরিচালিত আরএমটিপি প্রকল্পের ‘নিরাপদ মৎস্য ও মৎস্য পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ’ ভ্যালু চেইন উপ-প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি হাতে-কলমে আধা-নিবিড় পদ্ধতির মাছচাষ, ঘের ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য প্রয়োগ, পানি-মাটি পরীক্ষা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নিজের ৬৬ শতকের ঘেরে রুই, কাতলা, গলদা ও বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। প্রকল্পের মৎস্য সেবা ও পরামর্শ কেন্দ্রের সহায়তা নিয়ে তিনি ঘেরে স্থাপন করেন এ্যারেটর, ব্যবহার করেন ব্লু নেট, নিয়মিত চুন প্রয়োগের পাশাপাশি ঘেরের পানি-মাটির পরীক্ষা করান। ফলে ঘেরে রোগবালাই কমে যায় এবং উৎপাদন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১,১৭,০০০ টাকা, আর মোট বিক্রয় হয়েছে প্রায় ৩,৮০,০০০ টাকা—প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আয় ও লাভ দুটিই বেড়েছে উল্লেখযোগ্য।

মুসলিমা খাতুন বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তি, ব্লু নেট ও এ্যারেটর ব্যবহারের কারণেই আমার ঘেরে উৎপাদন বেড়েছে। এখন আমি শুধু স্বাবলম্বীই নই, আশপাশের অনেক মাছচাষি আমার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। সামনে আরও বড় পরিসরে মাছচাষের পরিকল্পনা করছি।”

স্বল্প শিক্ষিত একজন গৃহিণী থেকে আজ স্বনির্ভর নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা মুসলিমা স্থানীয়ভাবে এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা সাস-এর নির্বাহী পরিচালক শেখ ইমান আলী বলেন, “মুসলিমা খাতুনের গল্পটি প্রমাণ করে—সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা আর পরিশ্রম এক হলে পরিবর্তন হবেই। পরিবার চালাতে যেখানে কষ্ট হতো, আজ তিনি আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ব্যবহার আর নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চোখে পড়ার মতো সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রশিক্ষণ, ব্লু নেট, এ্যারেটর, পানি-মাটির পরীক্ষা—এসব শুধু ব্যবহারই করেননি, প্রতিদিন নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে আরও ভালো করার চেষ্টা করেছেন। এই মনোভাবই তাকে এগিয়ে দিয়েছে।”

মহারাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “মুসলিমা খাতুনের সাফল্য আমাদের ইউনিয়নের জন্য গর্বের বিষয়। সংসারের টানাপোড়েনে থাকা একজন নারী আজ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সফল মাছচাষি—এটাই উপকূলীয় এলাকার বাস্তব পরিবর্তনের উদাহরণ। সাস ও আরএমটিপি প্রকল্পের সহায়তা তার বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি যেমন নিজের ঘেরকে উন্নত করেছেন, তেমনি আশপাশের মানুষকেও নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন।”

মুসলিমা খাতুনের এই সাফল্যের যাত্রা প্রমাণ করেছে—সুযোগ পেলে নারীরাও পারে মাছচাষে বিপ্লব ঘটাতে।

আরও খবর