নিজস্ব প্রতিনিধি ২৪ জুন ২০২৫ , ৪:১০:১৬ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরার মরিচ্চাপ নদী যেন হঠাৎ ক্ষেপে গেছে! একের পর এক সাতটা ব্রিজ গিলে খেয়েছে এই নদী, আর এখন আরও কয়েকটা সেতুর দিকে তাকিয়ে হাসছে। সদর, দেবহাটা আর আশাশুনির ৩০টা গ্রামের মানুষ এখন যোগাযোগহীন, আর তাদের দিন কাটছে ঘুরপথে হাঁটতে হাঁটতে আর মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে। কী কান্ড, তাই না?
এই ব্রিজগুলো বানানো হয়েছিল ২০১৪-১৮ সালে, তখন মরিচ্চাপ নদী ছিল একটা সরু খালের মতো, জোয়ার-ভাটার নামগন্ধও ছিল না। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় তখন ধুমধাম করে ১০-১৫ মিটারের ছোট্ট ব্রিজ বানিয়েছিল। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কোনো কথা না বলে, এনওসি না নিয়ে, আর সিএস রেকর্ড না দেখে এই কাজ করায় এখন সবাই হাতে চাঁদ তুলে ধরেছে!
২০২১-২৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসে নদী খনন করল, আর মরিচ্চাপ ফিরে পেল তার পুরানো জৌলুস। নদী এখন ৫০-৭০ মিটার চওড়া, জোয়ারের পানি এসে ধাক্কা মারছে দুমদাম! ব্রিজের পাশের মাটি সরে গেল, আর সেতুগুলো একে একে বলল, “আমরা আর পারছি না, নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছি!”
যে সাতটা ব্রিজ এখন নদীর তলায় লুকোচুরি খেলছে, সেগুলো হলো, বাকড়া ব্রিজ, টিকেট ব্রিজ, হিজলডাঙ্গা ব্রিজ, চরগোবিন্দপুর ব্রিজ, শিমুলবাড়িয়া ব্রিজ, ডাড়ার খাল ব্রিজ, এল্লারচর ব্রিজ। গিয়ে দেখলে হাসি পাবে, কোথাও ব্রিজের একটা পাশ ঝুলছে, কোথাও পুরোটা নদীর মাঝে ডুব মেরেছে। কেউ কেউ বাঁশ বেঁধে পার হওয়ার চেষ্টা করছে, আর কোথাও বাঁশের সাকো বানিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করছে লোকজন।

এই ব্রিজ-বিপর্যয়ে সাতক্ষীরার ৩০টা গ্রামের মানুষ এখন মহা মুশকিলে। জেলা সদরে যেতে ৪-১০ কিলোমিটার রাস্তা থাকলেও এখন ঘুরে ২০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। টাকা যাচ্ছে, সময় যাচ্ছে, আর সবার মেজাজও যাচ্ছে!
চরগোবিন্দপুরের শুকুর আলী সরদার বললেন, “আগে নদীতে জোয়ার আসত না, এখন পানির তুবড়ি ছুটছে। ব্রিজ তো এত ছোট, পানির ধাক্কায় রাস্তা-ব্রিজ সব উড়ে গেছে!” ডাড়ার খালের আব্দুল মাজেদ তো কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, “হাটে যাই কীভাবে? স্কুলে ছেলে-মেয়ে পাঠাই কী করে? মাছের ঘের থেকে মাছ বাজারে নিতে পারছি না, পকেট ফাঁকা!”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান বললেন, “৭০ মিটারের নদীতে ১৫ মিটারের ব্রিজ? এটা তো টিকবেই না! আমাদের সঙ্গে কথা না বলে ব্রিজ বানিয়েছে, এখন দেখুন ফল!” তিনি আরও বললেন, নদী খনন করে তার আসল রূপ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ব্রিজগুলো তো খালের মাপে বানানো। সাতক্ষীরা সদরের ইউএনও সোয়েব আহমেদ বললেন, “চারটা ব্রিজ বানানোর জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি।” আর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শাহিনুল ইসলাম জানালেন, “ঘটনাস্থল দেখে এসেছি, এখন বড় সাহেবরা ব্যবস্থা নেবেন।”
স্থানীয়রা বলছে, এবার ব্রিজ বানানোর আগে একটু মাথা খাটানো দরকার। নদীর মাপ ঠিক করে, পানির চাপ হিসেব করে, আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বসে চা-বিস্কুট খেতে খেতে প্ল্যান করলে এমন হতো না। ততক্ষণে, গ্রামের মানুষ বাঁশের সাকোয় ঝুলে পার হচ্ছে, আর মনে মনে বলছে, “এ কেমন নদী রে বাবা!”

















