সাতক্ষীরা

জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে সুবিধাবঞ্চিতরা

  আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৯ জুন ২০২৫ , ৭:০৫:৩৪ অনলাইন সংস্করণ

শিল্পের অভাব ও অর্থনৈতিক মন্দায় হতাশার ছায়া
বেকারত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত জীবন
কর্মহীনতায় জর্জরিত সাতক্ষীরার বস্তি এলাকা

ছেঁড়া পলিথিন দিয়ে ঘেরা, টিনের চালে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে অস্থির হয়ে ওঠা ঘর। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও রান্নার হাঁড়িতে আগুন জ্বলে না। সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকায় এমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন শত শত পরিবার। ভোর থেকে রাতচেষ্টা থাকে শুধু পেট ভরানোর মতো কাজ খুঁজে পাওয়া। কিন্তু নেই কাজ, নেই উপার্জন। ফলে মানবেতর জীবন পার করছেন এইসব নিম্নআয়ের মানুষ।
সাতক্ষীরা শহরের বাঁকাল ইসলামপুর, খানজাহান আলী সড়ক সংলগ্ন বস্তি, কলোনি রোড, ব্র²রাজপুর সড়ক কিংবা নিউমার্কেটের পেছনের গলির ভেতরেই গড়ে উঠেছে একাধিক বস্তি। এখানে বসবাসরত অধিকাংশ মানুষ এসেছেন বিভিন্ন সময় নদীভাঙন বা জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে উপকূলীয় এলাকা থেকে। কারও বাড়ি শ্যামনগরের গাবুরা বা আশাশুনির প্রতাপনগরে, কেউ এসেছেন খুলনার কয়রা বা পাইকগাছা থেকে।
সুরক্ষা খোঁজার আশায় শহরমুখী হলেও এখানে এসে তারা পাচ্ছেন না কর্মসংস্থানের সুযোগ। ফলে দিনমজুরির অপেক্ষা করে দিন কাটাতে হয়।

বস্তিবাসীদের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা
সাতক্ষীরার বস্তিগুলোতে হাজার হাজার পরিবার বাস করে, যারা দৈনিক মজুরি, ছোটখাটো ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক কাজের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা, সীমিত শিল্প কার্যক্রম এবং মাছ ধরা ও কৃষির মতো ঐতিহ্যবাহী জীবিকার হ্রাসের কারণে অনেকেই স্থিতিশীল আয়ের উৎস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাতক্ষীরায় গত কয়েক বছর আগে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এটি পুনরুজ্জীবনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা শিল্প খাতে চাকরির সুযোগ আরও সীমিত করে দিয়েছে।
আব্দুল করিম, কামালনগরের ৪৫ বছর বয়সী একজন রিকশাচালক, তার দুর্দশার কথা বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমি আগে একটি চিংড়ি খামারে কাজ করতাম, কিন্তু গত বছর খামারটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আমি রিকশা চালাই, কিন্তু কিছু দিন এমন যায় যে আমার পরিবারের জন্য খাবার কেনার মতো টাকাও উপার্জন করতে পারি না। এখানে কোনো কারখানা বা চাকরি নেই। আমরা হাতে মুখে জীবনযাপন করছি, আর এটি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।”
ফাতেমা বেগম, ইটাগাছার ৩২ বছর বয়সী তিন সন্তানের মা, একই ধরনের অভিযোগ করে জানান, “আমি বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতাম, কিন্তু এখন অনেক পরিবার আর ঝি রাখতে পারে না। আমার স্বামী একজন দিনমজুর, কিন্তু নির্মাণ কাজও খুব কম। আমরা আমাদের বাচ্চাদের স্কুলের ফি দিতে পারি না, এমনকি কখনো কখনো খাবার না খেয়ে থাকতে হয়। সরকারকে আমাদের এলাকায় চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।

স্থানীয় অর্থনীতি এবং বেকারত্ব
সাতক্ষীরার অর্থনীতি মূলত কৃষি এবং চিংড়ি চাষের উপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ৬৭,০০০ হেক্টর জমি চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং বছরে ২২,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদান হয়। কিন্তু যান্ত্রিকীকরণ এবং লবণাক্ততার মতো পরিবেশগত সমস্যার কারণে এই খাতে শ্রমের চাহিদা কমে গেছে। সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলসের মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে গেছে।
সাতক্ষীরার প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা: বিষ্ণু পদ বিশ্বাস অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তুলে বলেন, “স্থানীয় অর্থনীতি চিংড়ি চাষ এবং কৃষির উপর নির্ভরশীল, কিন্তু এই খাতগুলো বস্তি এলাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত চাকরি সৃষ্টি করছে না। আমাদের পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং ছোট আকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যা এই বেকার শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে।”

নারী ও তরুণদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে
বস্তি এলাকার মেয়েরা কোন কাজের সুযোগ না পেয়ে গৃহকর্মে নিযুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও নিয়মিত বেতন বা নিরাপত্তা নেই। অনেক সময় হয় যৌন হয়রানির শিকার।
তরুণদের অনেকে আবার যুক্ত হচ্ছেন মাদক পরিবহন বা চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে। সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের নজর না থাকায় এসব অপরাধ দিনদিন বাড়ছে।

শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার
বস্তি এলাকার শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাম লিখিয়েও টিকে থাকতে পারছে না অনেকেই। অনেকে রিকশা গ্যারেজে কাজ করছে, কেউ চায়ের দোকানে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে তারা যোগ দিচ্ছে অদক্ষ শ্রমিকবাহিনীতে এক অচল উন্নয়নের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে এই শিশুরা।

সরকার এবং এনজিও’র দৃষ্টিভঙ্গি
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সংকট সম্পর্কে সচেতন, তবে সীমিত সম্পদ এবং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। সাতক্ষীরা সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, “আমরা বস্তি এলাকায় বেকারত্বের সমস্যা সম্পর্কে অবগত। তবে সমস্যার পরিমাণ বিশাল। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং আরও শক্তিশালী সরকারি নীতির প্রয়োজন।”
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানাযায়, “বস্তিবাসীদের জন্য সরকারি কিছু সাহায্য-সহযোগিতা চালু আছে। তবে কর্মসংস্থানের দিকটি আরও জোরালোভাবে ভাবা দরকার। আমরা স্থানীয় এনজিওদের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছি।”
সাতক্ষীরায় কার্যরত এনজিওগুলো লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনজিরও’র সমন্বয়ক জানান,“বস্তিতে বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। পরিবারগুলো মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারছে না, যার ফলে শিশুশ্রম এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঘটনা বাড়ছে। আমরা হস্তশিল্প সমবায় এবং ছোট আকারের উদ্যোগের মাধ্যমে সম্প্রদায়-ভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচির জন্য কাজ করছি।”
সুলতানপুর এবং ইসলামপুর বস্তির বাসিন্দারাও চাকরির অভাব এবং সরকারি সহায়তার অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। রাশেদা খাতুন, সুলতানপুরের ২৮ বছর বয়সী একজন বাসিন্দা তিনি জানান, “এখানে কাছাকাছি কোনো কারখানা বা কর্মশালা নেই। আমি একটি ছোট দর্জি ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মূলধন বা প্রশিক্ষণ ছাড়া এটি অসম্ভব। সরকারের উচিত আমাদের ঋণ বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে আমরা নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারি।”
মোহাম্মদ আলী, ইসলামপুরের একজন বাসিন্দা তিসি বলেন, “আমাদের বস্তির অনেক তরুণ বেকার বসে আছে কারণ কোনো কাজ নেই। এটি হতাশা এবং কখনো কখনো অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের চাকরির মেলা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ছোট কারখানা প্রয়োজন যাতে আমাদের তরুণরা জীবিকা অর্জন করতে পারে।”

পদক্ষেপের আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা একটি বহুমুখী সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, মাইক্রোক্রেডিট সুবিধা এবং স্থানীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন। বস্তি এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু, হস্তশিল্প-কারখানা গড়ে তোলা, বস্তিবাসী নারীদের আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধকরণ এবং কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এই পদক্ষেপগুলো নিতে পারলে ধীরে ধীরে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। সরকার, বেসরকারি খাত এবং এনজিও’র সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাতক্ষীরার বস্তি এলাকাগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এই সংকটের সমাধান না হলে, সাতক্ষীরার বস্তিবাসীদের জীবনযাত্রার মান আরও অবনতি হবে, যা সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণ হতে পারে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট: তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সাতক্ষীরার বস্তি এলাকার মানুষরা শুধু খাবার নয়, সম্মানজনক জীবনের স্বপ্ন দেখেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে এই মানুষগুলোর জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্র, সমাজ ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত আন্তরিকতা।

আরও খবর