আহসানুর রহমান রাজীব ৩০ অক্টোবর ২০২৫ , ২:৩৩:৩১ অনলাইন সংস্করণ
পাশের জেলাগুলোর তুলনায় উন্নয়ন মাত্র ৩০ ভাগ
রাস্তা ভাঙা, রেল নেই, স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, শিল্প, সব খাতেই পিছিয়ে
টেকসই পরিকল্পনায় বদলে যেতে পারে চিত্র
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এক সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরা। সুন্দরবন, চিংড়ি, আম, মধু, মাছ, ভোমরা স্থলবন্দর, সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই জেলা। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, খুলনা বিভাগের আট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় হওয়া সত্তে¡ও উন্নয়নের দৌড়ে সবচেয়ে পিছিয়ে সাতক্ষীরা। সরকারি উন্নয়ন সূচকে এই জেলার অবস্থান শেষের দিকে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে খুলনা, যশোর ও বাগেরহাটে যে পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তার মাত্র ৩০ শতাংশ সুবিধা সাতক্ষীরা পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিল্প, পর্যটন, সব খাতেই বৈষম্য প্রকট।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অংশজুড়ে বিস্তৃত সাতক্ষীরা পরিবেশগত দিক থেকে যেমন অমূল্য, তেমনি বাণিজ্যিকভাবেও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ভোমরা স্থলবন্দর এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব কেন্দ্র, যা প্রতিবছর সরকারের কোষাগারে বিপুল অর্থ যোগ করে। সাতক্ষীরার ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি শিল্প জাতীয় রপ্তানি আয়ের অন্যতম ভিত্তি, হাজার হাজার পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভর করে বাঁচে। সুস্বাদু আম, মধু, মাছ, নারকেল, লবণাক্ত সহনশীল কৃষিপণ্য এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকোটুরিজম সাতক্ষীরাকে করেছে সমৃদ্ধ। অথচ এই প্রাচুর্যের মাঝেও জেলাটি যেন উন্নয়নের অন্ধকারে নিমজ্জিত।
জেলার উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামীণ রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষাকালে এসব রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অনেক এলাকা। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে নিতে হয় নৌকায়। খুলনা ও যশোরের সঙ্গে এখনো কোনো রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়নি, ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন। অবকাঠামোগত এই দুর্বলতা সাতক্ষীরার সার্বিক অর্থনীতিকে করে তুলেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা বঞ্চিত। এত বড় জেলায় আজও কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়নি। কয়েক বছর আগে অনুমোদন পাওয়া “সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের খুলনা বা ঢাকায় যেতে হয়; অনেকেই আর ফিরে আসে না, ফলে স্থানীয়ভাবে শিক্ষিত তরুণদের ঘাটতি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে গভীর সংকট। সম্প্রতি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ফলে কিছুটা সেবা মিলছে, তবে সেখানে নেই পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে গুরুতর রোগীরা এখনো খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ঢাকা পর্যন্ত যেতে বাধ্য হন। বহু গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক থাকেন না, অনেক জায়গায় ওষুধ ও ল্যাবসুবিধা নেই। স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর এই সংকট মানুষের জীবনের মানকে নিম্নগামী করে তুলছে।
ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডর, আম্পান কিংবা ইয়াস, প্রতিটি দুর্যোগ সাতক্ষীরাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে, মিষ্টি পানির সংকটে নারী ও শিশুরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বাঁধ দুর্বল হওয়ায় প্রতি বর্ষায় প্লাবনে ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম। সরকার নানা সময় কিছু প্রকল্প হাতে নিলেও তা টেকসই নয়, বরং অনেক সময় কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন এখনো অনেকাংশে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
প্রশাসনিক দিক থেকেও সাতক্ষীরা বঞ্চিত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা জানান, সাতক্ষীরাকে প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, ফলে বদলি, পদোন্নতি বা বিশেষ প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেতিবাচক প্রচারণাও এ জেলার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে প্রশাসনে অনুপ্রেরণার অভাব দেখা দিয়েছে, যা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে আরও ধীর করে দিয়েছে।
ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা সাতক্ষীরার বঞ্চনার বড় কারণ। দেশের অন্যতম রাজস্বদাতা জেলা হয়েও সাতক্ষীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। আম, মাছ, চিংড়ি, মধু, বন্দর, সবখান থেকে দেশ অর্থ আয় করে, কিন্তু সেই আয়ের অল্প অংশই ফেরত আসে এই জেলার উন্নয়নে। পাশের জেলাগুলিতে সড়ক, শিল্পাঞ্চল, বিশ্ববিদ্যালয়, রেল ও আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠলেও সাতক্ষীরায় উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি যেন স্থবির।
সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় ফোরামের সভাপতি ইকবাল মাসুদ বলেন, “সাতক্ষীরা বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা। জাতীয় রাজস্বে আমাদের অবদান যথেষ্ট, কিন্তু গত ১৭ বছরে কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্প এখানে বাস্তবায়িত হয়নি। খুলনা ও যশোরের তুলনায় সাতক্ষীরায় উন্নয়নের অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ। এই বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য। এখন সময় এসেছে সাতক্ষীরার মানুষকে তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার।”
ঢাকাস্থ সাতক্ষীরা জেলা সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, “সুন্দরবন সাতক্ষীরার মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ এখানকার মানুষ এখনো মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সব খাতেই অবহেলা চোখে পড়ে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া এই জেলার উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন দরদির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা করুণ, সুপেয় পানির সংকট তীব্র, স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা প্রকট। খেলাধুলার জন্য কোনো আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স নেই, নেই ফুড প্রসেসিং সেন্টার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার বা রেল সংযোগ। সাতক্ষীরার উন্নয়ন বঞ্চনার অবসান ঘটাতে এখনই বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার।”
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখছি সাতক্ষীরাকে পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। উপকূলীয় জেলা হয়েও দুর্যোগ মোকাবিলায় যথাযথ বিনিয়োগ হয়নি। নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, কৃষি ও স্বাস্থ্য, সবখানে অব্যবস্থাপনা। আমরা ন্যায্য উন্নয়ন অধিকার চাই, কোনো দয়া নয়।”
সাতক্ষীরার উন্নয়ন বঞ্চনার আরেকটি বড় কারণ হলো যোগাযোগ অবকাঠামোর চরম দুরবস্থা। একসময় নৌবাণিজ্যের জন্য খ্যাত ছিল এই জেলা। কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ, কালিন্দি, খোলপেটুয়া, এসব নদী পথ ধরে সাতক্ষীরার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারের সঙ্গে যশোর, খুলনা ও দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের নৌ যোগাযোগ ছিল সরগরম। কিন্তু বছরের পর বছর নদী খনন না হওয়া, পলি জমে নাব্যতা হারানো এবং নদী দখল-দূষণের কারণে এখন সাতক্ষীরার প্রায় সব নৌ রুট বন্ধ হয়ে গেছে। পাটকেলঘাটার সেই জমজমাট নৌবন্দর আজ অতীত ইতিহাস। একসময় যেখানে নৌযান চলাচল করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণ সঞ্চার করত, সেখানে এখন ভরাট নদী আর আগাছায় ভরা খাল পড়ে আছে।
নৌরুট নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে জেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পরিবহন এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সড়কপথের ওপর। কিন্তু সড়কগুলোর অবস্থাও ভয়াবহ। সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক, সাতক্ষীরা-যশোর আঞ্চলিক মহাসড়ক, কালিগঞ্জ-শ্যামনগর সড়ক, সবখানেই ভাঙা রাস্তা, গর্তে ভরা পথ। বৃষ্টির সময় কাদা, শুকনো মৌসুমে ধুলো দুই অবস্থাতেই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সড়কের ভাঙা অংশে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা, খাদ্যপণ্য পরিবহনে সময় লাগছে দ্বিগুণ।
দেশের অন্য জেলার প্রধান সড়কগুলো যখন ৪ লেন, এমনকি ৬ লেনে উন্নীত করা হচ্ছে, তখন সাতক্ষীরায় এখনও পুরোনো দুই লেনের সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা-যশোর মহাসড়ক, যা দেশের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য রুট, সেটির প্রশস্তকরণ ও আধুনিকীকরণের কোনো পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে ভোমরা স্থলবন্দরে আসা-যাওয়া ট্রাকগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকে, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়, ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার।
পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়ক প্রশস্ত করা এবং পুরনো নৌ রুটগুলো পুনরুদ্ধার না করলে সাতক্ষীরার অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়বে। কৃষিপণ্য, চিংড়ি, আম, মাছসব রপ্তানি পণ্য সময়মতো বন্দরে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হয়েও যোগাযোগ ব্যবস্থার এই করুণ অবস্থা স্থানীয়দের কাছে এক গভীর বঞ্চনা।
সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু বলেন, “নৌরুটগুলো সচল থাকলে পরিবহন খরচ অনেক কম হতো, স্থানীয় ব্যবসার গতি বাড়ত। এখন সবকিছুই ট্রাকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং সময় নষ্ট হচ্ছে। ভোমরা বন্দরকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরায় অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব, কিন্তু যোগাযোগ অবকাঠামোর দুরবস্থার কারণে সে সম্ভাবনা থমকে আছে। ভোমরা বন্দর পর্যন্ত রেল লাইন হলে ব্যবসা বাণিজ্য বাড়বে”
জেলাবাসীও একাধিক দাবি তুলেছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, রেললাইন স্থাপন, সুন্দরবন ঘিরে টেকসই ইকোটুরিজম, উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, অনুমোদিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চালু, সার্ভেয়ার ইনস্টিটিউট, আধুনিক বাস টার্মিনাল ও আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, ফুড প্রসেসিং প্ল্যান্ট, এবং মাদক ও সীমান্তে চোরাচালান রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্ভাবনাময় এই জেলাকে টেকসই উন্নয়নের মূলধারায় আনতে এখনই প্রয়োজন “সাতক্ষীরা উন্নয়ন ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা প্রকল্প” গ্রহণ, যাতে থাকবে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকা, সব খাতের সমন্বিত পরিকল্পনা। পাশাপাশি, প্রশাসনিক পদোন্নতি, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও শিল্প বিনিয়োগে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সাতক্ষীরা দেশের জন্য অক্সিজেন দেয়, রাজস্ব দেয়, কিন্তু তার বিনিময়ে পায় না প্রাপ্য সুযোগ। তাই এই জেলার উন্নয়ন শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি একটি ন্যায্যতার দাবি। সরকার যদি এখনই সাতক্ষীরাকে অগ্রাধিকারে না আনে, তাহলে উপকূলীয় বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এখন সময় এসেছে সাতক্ষীরাকে প্রাচুর্যের জেলা নয়, টেকসই উন্নয়নের জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।

















