শ্যামনগরের কুমোরপাড়ায় থেমে গেছে চাকার ঘূর্ণন। একসময়ের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। আধুনিক প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও সিলভারের আধিপত্যে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলস, দইয়ের পাতিলের কদর হারিয়ে গেছে। কালের বিবর্তনে মানুষের রুচি, প্রযুক্তি আর বাজারের প্রবণতা বদলে যাওয়ায় অনেক মৃৎশিল্পী অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ টিকে থাকার লড়াই করছেন দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী, নুরনগর, কাশিমাড়ী, নওয়াবেকী, খানপুর ও শংকরকাটি ছিল একসময় মৃৎশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চরকা ঘুরিয়ে হাঁড়ি-পাতিল, ফুলের টব, দইয়ের পাতিল ও খেলনা তৈরি করতেন মৃৎশিল্পীরা। কিন্তু এখন সেই কোলাহল নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে। অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন, সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
নুরনগর গ্রামের রাধা পাল বলেন, “আগের মতো মাটির জিনিসের চাহিদা নেই। বাজারে দাম কম, অথচ লাকড়ি ও মাটির দাম বেড়েছে। চরকা ঘুরিয়ে হাঁড়ি-পাতিল বানানোর আনন্দ এখন শুধুই স্মৃতি।” একই অভিজ্ঞতা লিপিকা পালেরও। দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জীবিকা নির্বাহ অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি ও তার স্বামী অন্য কাজের সন্ধান করছেন।
চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন। নুরনগরের অজিত পাল বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে মোটর গ্যারেজে কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, “আগে ভালো আয় হতো, এখন মানুষ আর মাটির হাঁড়ি-পাতিল কেনে না। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে গ্যারেজে কাজ করছি।” হরিপাল মৃৎশিল্প ছেড়ে মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও বিকাশের দোকান খুলেছেন। তার মতে, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের কম খরচের আধুনিক সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মাটির জিনিসের কদর কমে গেছে। ফলে জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়েই পেশা বদলাতে হয়েছে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ মৃৎশিল্প রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময়ের সমৃদ্ধ এই শিল্প অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।