আহসানুর রহমান রাজীব ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৪:৩৬:৩০ অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ মানুষ ইসলামের অনুসারী। তবে একই সঙ্গে এই ভূখণ্ডে দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করে আসছে। দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতরে এই বহুত্ববাদী চর্চাই আমাদের সামাজিক জীবনের সৌন্দর্য। শারদীয় দুর্গোৎসব সেই ঐতিহ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
সাতক্ষীরায় এ বছর ৫৮৭টি পূজামণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। গ্রাম থেকে শহর, সব জায়গাতেই এখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজে শিল্পীদের ব্যস্ততা, রঙতুলির ছোঁয়া, মণ্ডপ সাজানোর আলোকসজ্জা এবং ঢাকের শব্দ, সব মিলিয়ে এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি করেছে। যদিও জেলার ৫৫টি মণ্ডপ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি পূজা নির্বিঘ্ন করার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এই প্রস্তুতি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নয়, বরং মানুষের আস্থাকে দৃঢ় করার একটি প্রক্রিয়াও বটে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নতুন কিছু নয়। গ্রামীণ সমাজে যুগ যুগ ধরে মুসলমান ও হিন্দু পরিবার একে অপরের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়ে উঠেছে। গ্রামে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলে পাশের বাড়ির মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্গোৎসবেও এই চিত্র দেখা যায়। পূজার আয়োজন সফল করতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিম প্রতিবেশীরা স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করে থাকেন। কেউ মণ্ডপ সাজাতে সাহায্য করেন, কেউ নিরাপত্তায় সচেতন ভূমিকা পালন করেন, আবার কেউ বন্ধুত্বের খাতিরে পূজার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। এভাবে পারস্পরিক সৌহার্দ্যই সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
এই সম্প্রীতির ধারা শুধু দুর্গাপূজায় সীমাবদ্ধ নয়। মুসলমানদের ঈদ উৎসবেও হিন্দু-খ্রিষ্টান প্রতিবেশীরা শুভেচ্ছা জানাতে আসেন, মিষ্টি বিনিময় করেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও এই শুভেচ্ছা ও সহমর্মিতাই আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি।
বিশ্বের অনেক দেশে যখন ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা তুলনামূলক ভিন্ন। এখানে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ একই গ্রামে, একই মহল্লায় বসবাস করছে। তারা একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে। সাতক্ষীরার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষেরও আন্তরিক ভূমিকা রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবকে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জনগণের সহযোগিতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় একটি শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এটাও সত্য, মাঝে মাঝে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে কোনো কোনো স্থানে হামলার ঘটনাও দেখা গেছে। এসব ঘটনা আমাদের সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণকেও সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে সঙ্গে সঙ্গে তা খণ্ডন করা, অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার সম্মিলিত সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নিয়েছিল। স্বাধীনতার পরও সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিরও অংশ।
একটি দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা অপরিহার্য। যখন মানুষ ভিন্ন ধর্মকে সম্মান করে, তখন সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই এই আস্থা একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। সাতক্ষীরার মতো সীমান্তবর্তী জেলায় যেখানে নানা সংস্কৃতি ও প্রভাব মিলেমিশে আছে, সেখানে সম্প্রীতির গুরুত্ব আরও বেশি।
আমাদের প্রত্যাশা সাতক্ষীরার পূজামণ্ডপগুলো থেকে এইবারও শান্তি ও সহযোগিতার বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। পূজা শেষে যেন সেই সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়, মানুষ একে অপরকে আরও কাছাকাছি টেনে নেয়। ধর্ম ভিন্ন হলেও আমরা সবাই একই দেশের নাগরিক। আমাদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে দিয়েই প্রকৃত মানবিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একটি জাতির শক্তি। এই শক্তি যদি টিকে থাকে, তবে যে কোনো ষড়যন্ত্র ও বিভাজনকে মোকাবিলা করা সম্ভব। তাই দুর্গোৎসব শুধু আনন্দের উৎসব নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠুক এটাই কাম্য।
লেখক : আহসানুর রহমান রাজীব, গণমাধ্যম কর্মী।

















