বিশেষ প্রতিবেদন

ফায়ার সার্ভিস: আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই

  আহসানুর রহমান রাজীব ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৬:২৭:৪০ অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভ্রান্ত ধারণা চালু আছে,“তাদের কোনো কাজ নেই, বসে বসে বেতন খায়।” অথচ বাস্তবতা একেবারেই উল্টো। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা উদ্ধার অভিযানে তারাই ছুটে যান সবার আগে। তারা জানেন, একবার ঘন্টা বাজলেই তাদের জীবন আর নিরাপদ থাকে না। তবুও তাঁরা দৌঁড়ে যান আগুনের কাছে, ভেঙে পড়া ভবনের কাছে, কিংবা ডুবে যাওয়া লঞ্চের পাশে।

বাবার চাকরির সুবাদে আমার নিজের শৈশব কেটেছে ফায়ার সার্ভিসের কোয়ার্টারে। দেখেছি, জরুরি কল আসলেই কিভাবে কর্মীরা জীবন বাজি রেখে গাড়িতে চড়ে বেরিয়ে যান। কেউ খেতে বসে আছেন, কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ নামাজ পড়ছেন,ডাকে সাড়া দিতে সবকিছু ফেলে রেখে দৌড়ে যান। এক সেকেন্ড দেরি হলে জনতার হাতে মার খাওয়া কিংবা গাড়ি ভাঙচুর পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছে তাদের। অথচ তারা যে প্রতিদিনই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন রক্ষার মিশনে ছুটে যাচ্ছেন, এ সত্য আমরা কতটা উপলব্ধি করি?

সোমবার গাজীপুরের টঙ্গীতে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে চারজন ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন শতভাগ দগ্ধ, বেচে থাকার সম্ভাবনা কম। আর বেচে থাকলেও আজীবন আগুনের ক্ষত বয়ে বেড়াবেন। আগুনের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করা এই মানুষগুলো নিজেরাই যখন আগুনে দগ্ধ হন, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট করেছি?

এর আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একের পর এক ফায়ার সার্ভিসের কর্মী প্রাণ দিয়েছেন। বনানীর এফআর টাওয়ার ট্র্যাজেডি, প্রতিটি দুর্ঘটনায় জীবন দিয়েছেন ফায়ার ফাইটাররা। মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রাপ্য মর্যাদা ও সহায়তা নিয়ে?

এই কষ্ট আমার কাছে নিছক পরিসংখ্যান নয়, একেবারেই ব্যক্তিগত। আমার মেঝ ভাই ফায়ার ফাইটার, পরিবারের আরেক সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করছে। তাই ফায়ার সার্ভিসের প্রতিটি সদস্য আমার আপনজন। তাদের প্রতিটি কান্না আমার পরিবারের কান্না, তাদের প্রতিটি রক্তক্ষরণ আমার বুকের ভেতরেই বয়ে যায়। আসলে দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই এই ব্যথা অনুভব করা উচিত, কারণ তাদের জীবন বাজি রাখার কারণেই আমরা নিরাপদ।

ফায়ার সার্ভিসের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব একটাই, মানুষকে বাঁচানো। অথচ তারা নিজের জীবন রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পান না। অগ্নি নির্বাপণ কাজে ব্যবহৃত পোশাক, বুট, গ্লাভস, হেলমেট, সবকিছুই নিম্নমানের বা অপর্যাপ্ত। আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই বললেই চলে। রাসায়নিক কারখানার অগ্নিকাণ্ডে যে ধরণের বিশেষ সরঞ্জাম প্রয়োজন, তা ফায়ার সার্ভিসের কাছে থাকে না। ফলে আগুন নেভানোর বদলে আগুনে দগ্ধ হয়ে পড়েন তারাই।

রাষ্ট্র কেবল প্রশংসার বুলি আওড়ায়,“তারা বীর, তারা সাহসী।” কিন্তু প্রশংসা দিয়ে কি তাদের জীবন রক্ষা করা যায়? তাদের পরিবার কি কেবল প্রশংসা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে? দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের পরিবার কি সঠিক ক্ষতিপূরণ, বিমা বা পুনর্বাসন পায়? উত্তরটা দুঃখজনকভাবে ‘না’। ফায়ার সার্ভিসের যোদ্ধারা যেন মৃত্যুর পরেই কেবল সম্মানিত হন, জীবিত অবস্থায় নয়।

বিশ্বের অনেক দেশেই ফায়ার সার্ভিসকে গণমানুষের নিরাপত্তার প্রথম সারির বাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়। উন্নত সরঞ্জাম, সুরক্ষা গিয়ার, উচ্চ বেতন, স্বাস্থ্যসুবিধা, সবকিছুই থাকে তাদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা জাপানে একজন ফায়ার ফাইটারের সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। সেখানে তারা শুধু কর্মচারী নন, বরং জাতির রক্ষক। আমাদের দেশে সেই মানদণ্ড এখনো স্বপ্নের মতোই রয়ে গেছে। ফায়ার ফাইটাররা এখানে নীরব যোদ্ধা, যাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় মূলত দুর্ঘটনার পর।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব? ফায়ার সার্ভিসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে আধুনিক করা, প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করা এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া এটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড, প্রতিটি দগ্ধ শরীর আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম দলিল হয়ে দাঁড়ায়। শুধুমাত্র “তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না”বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।
ফায়ার সার্ভিস শুধু একটি চাকরি নয়, এটি আত্মত্যাগ। এটি অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করার শপথ। অথচ এই বীররা পান না প্রাপ্য সম্মান, পান না প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা। তারা বীরত্বের স্বীকৃতি পান কেবল মৃত্যুর পর, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

লেখক : আহসানুর রহমান রাজীব, গণমাধ্যম কর্মী

আরও খবর