আহসানুর রহমান রাজীব ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৩:৩৭:৪৩ অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেরই কিছু নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। সাতক্ষীরার পলাশপোলের গুড়পুকুরের মেলা ঠিক তেমনই একটি ঐতিহ্য, যা প্রায় চার শতাব্দী ধরে টিকে আছে মানুষের বিশ্বাস, আনন্দ আর সামাজিক সম্প্রীতির সাক্ষ্য হয়ে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সাতক্ষীরার মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে ভাদ্র মাসের শেষ দিনে মনসা পূজাকে ঘিরে এ মেলার সূচনা হয়। জনশ্রুতি আছে, এক ক্লান্ত পথিক বটগাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি বিষধর সাপ ফণা তুলে তাকে ছায়া দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় মনসা পূজা এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গুড়পুকুরের মেলা। পুকুরের নামকরণ নিয়েও নানা মত প্রচলিত আছে, কেউ বলেন প্রসাদের কারণে পানি মিষ্টি হতো, কেউ বলেন স্বপ্নাদেশে গুড় ফেলার ফলে পানি এলো, আবার কারো মতে খেজুর গাছের রস থেকে তৈরি গুড় বিক্রি করে এ পুকুর খনন হয়েছিল। ইতিহাসবিদ আবদুস সোবহান খান চৌধুরীর মতে, এটি ছিল মূলত “গৌরদের পুকুর,” যা সময়ের বিবর্তনে “গুড়পুকুর” নাম ধারণ করে।
গুড়পুকুরের মেলা সাতক্ষীরার মানুষের কাছে শুধু পূজা নয়, এটি জীবিকার উৎস। নার্সারি ব্যবসায়ী, ডেকোরেটর মালিক, খেলনার দোকানদার, মিষ্টির ফেরিওয়ালা, চটপটি-ফুচকা বিক্রেতা, হস্তশিল্পী ও কুটির শিল্পীরা সারা বছরের বড় অংশের আয়ের ওপর নির্ভর করেন এই মেলার ওপর। নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা, বাউলগান, সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কেন্দ্র। শিশু-কিশোরদের জন্য এটি বিনোদনের, আর বয়স্কদের জন্য এটি সামাজিক সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।
২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই মেলাকে ঘিরে ঘটে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা। সাতক্ষীরার একটি সিনেমা হল ও স্টেডিয়ামের সার্কাস প্যান্ডেলে বোমা হামলায় তিনজন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। এই ঘটনার পর দীর্ঘ ছয় বছর ধরে মেলা বন্ধ থাকে। ২০০৯ সালে পুনরায় মেলার সূচনা হলেও তখন এক মাসের পরিবর্তে মাত্র ১০ দিন চলেছিল। তবুও মানুষ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, গুড়পুকুরের মেলা কেবল উৎসব নয়, এটি মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও সাহসের প্রতীক।
আজ প্রশ্ন হলো, যখন দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বিঘ্নে বইমেলা, বাণিজ্য মেলা বা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন সাতক্ষীরার মানুষ কেন তাদের চার শত বছরের ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে? যদি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে, সেটি সমাধান করা প্রশাসনের দায়িত্ব। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব। অথচ প্রশাসনিক অবহেলায় যদি মেলা বন্ধ থাকে, তবে সেটি সাংস্কৃতিক আত্মঘাতিতা ছাড়া কিছুই নয়।
গুড়পুকুরের মেলাকে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু বিনোদন সংরক্ষণ নয়; এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির ধারাকে টিকিয়ে রাখা। এজন্য প্রশাসনকে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসন যৌথ উদ্যোগে মেলার আয়োজন নিয়মতান্ত্রিকভাবে করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। ঐতিহ্যকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
গুড়পুকুরের মেলা সাতক্ষীরার মানুষের প্রাণের অংশ। এটি শত শত বছরের ঐতিহ্য, যা আজও মানুষকে আনন্দ, ঐক্য আর সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করে। এ ঐতিহ্যকে বন্ধ করে রাখা মানে মানুষের শেকড় ছিন্ন করা। প্রশাসন ও সরকারের উচিত হবে মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং ঐতিহ্য রক্ষা করা। সাতক্ষীরার মানুষের প্রাণের দাবি, গুড়পুকুরের মেলা আবার বসুক, ঐতিহ্যের প্রদীপ আবার জ্বলুক।
আহসানুর রহমান রাজীব, গণমাধ্যম কর্মী

















