সাতক্ষীরা

বিশ্ব পর্যটন দিবসে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ: অপার সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

  আহসানুর রহমান রাজীব ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৭:৪০:৪০ অনলাইন সংস্করণ

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO) ১৯৮০ সাল থেকে এ দিবসটি পালন শুরু করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য “Tourism and Peace” যা উন্নয়ন, সংস্কৃতি বিনিময় এবং পরিবেশ সুরক্ষায় পর্যটনের ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্য দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই দেশ পর্যটন শিল্পে এক বিশাল সম্ভাবনার অধিকারী। বিশেষ করে সুন্দরবন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সুন্দরবনের মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ ভৌগোলিক অবস্থান, নদী-খাল আর প্রাণবৈচিত্র্যের কারণে অনন্য হলেও পর্যটন বিকাশে এখনো অনেক পিছিয়ে।

পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর সুন্দরবনে প্রায় ২ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জে আসেন মাত্র ১৫-২০ হাজার, যা মোট পর্যটকের ১০ শতাংশেরও কম। অথচ এই অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, বানর, অসংখ্য প্রজাতির পাখি, নদী-খাল, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত এবং পুটনির দ্বীপসহ বহু প্রাকৃতিক আকর্ষণ রয়েছে। স্থানীয় লোকসংস্কৃতি, বনজীবী ও জেলেদের জীবনযাপন, মধু, মাছ, কাঁকড়াসহ নানা খাবার পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হতে পারত। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা গেলে শুধু সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকেই বছরে প্রায় শত কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

কিন্তু বাস্তবতা হতাশাজনক। সাতক্ষীরায় কোনো আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল বা রিসোর্ট নেই। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় আবাসিক ও ভালো মানের খাবারের হোটেলও কম। বরসা ও টাইগার পয়েন্ট নামে দুটি বেসরকারি রিসোর্ট ও জেলা পরিষদের একটি ডাকবাংলো ও আকাশনীলা নামে একটি সরকারি রেস্ট হাউস থাকলেও সেগুলোর রুম সংখ্যা কম। রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল, ফলে পর্যটকরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে চান না। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলা শহরে কিছু সাধারণ মানের হোটেল থাকলেও তা বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। একইভাবে সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ জলযানও নেই। পর্যটকদের বেশিরভাগই বাধ্য হয়ে স্থানীয় ট্রলার বা ছোট নৌকায় ভ্রমণ করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর। এজন্য অনেকে এই রুটে পরিবার নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন না। এছাড়া সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত রাস্তাটির বেহাল দশার কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমেছে।

নিরাপত্তা আরেকটি বড় প্রশ্ন। যদিও সরকার ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছে, তবু পর্যটকদের মনে এখনো ভয় রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন বনদস্যুদের আতঙ্কে থাকার কারণে এ অঞ্চলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটনশিল্পের বিকাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে পর্যটকদের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায়। বন বিভাগের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, সমগ্র সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১২৫টি। একসময় হাজার হাজার চিত্রা হরিণ দেখা গেলেও চোরাশিকারীদের তান্ডবে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চোরাশিকার, পরিবেশ বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন এ সংকটকে আরও তীব্র করছে।

পরিবেশগত বিপর্যয়ও পর্যটন সম্ভাবনার জন্য বড় হুমকি। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পানসহ একের পর এক দুর্যোগ সুন্দরবনকে বিপর্যস্ত করেছে। বেড়েছে লবণাক্ততা, শুকিয়ে যাচ্ছে গাছ, ভরাট হচ্ছে নদী-খাল। ফলে বনভূমির সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই বনকে ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করেন লাখো মানুষ। জেলে, মধু সংগ্রাহক, গোলপাতা কাটাসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষদের জীবনের সাথে পর্যটনের বিকাশ জড়িয়ে আছে। যদি পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হয়, তবে এদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতক্ষীরা রেঞ্জে পর্যটন বিকাশে অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভুগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ.ন.ম. গাউছার রেজা বলেন, সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক ঐতিহ্য। সাতক্ষীরায় পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারি নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ একসাথে জরুরি।

সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় পরিবেশকর্মী মো. ফজলু হোসেন মনে করেন, পরিবেশ ধ্বংস হলে পর্যটন টিকবে না। তাই বনের গাছ রক্ষা, নদী খনন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অপরিহার্য। বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন বাজেট ও বিনিয়োগ সংকট বড় বাধা। আবার স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণ ও অনুমোদনের জটিলতা দূর হলে তারাও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

নীতিগত দিক থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও আধুনিক জলযান চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বন ও জলপথে নিরাপত্তা জোরদার করে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ বন্যপ্রাণি সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের সরাসরি অংশীদার করতে হবে, কমিউনিটি ট্যুরিজম চালু করা গেলে দারিদ্র্য কমবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণও সম্ভব হবে। ষষ্ঠত, পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ, গাছ কাটা বন্ধ এবং পুনরায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিতে হবে। সপ্তমত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুন্দরবনের পর্যটন প্রচারে ট্রাভেল ফেয়ার, ডকুমেন্টারি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা বাড়াতে হবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জকে ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। এখানে রয়েছে অপরিসীম সম্ভাবনা, কিন্তু বাস্তবে রয়েছে সীমাহীন সংকট। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও পরিবেশ সংরক্ষণ একসাথে হলে এই অঞ্চল শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যটনের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। সুন্দরবন আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই আজকের অঙ্গীকার হোক, আমরা এই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করব, সম্ভাবনাকে কাজে লাগাব এবং বিশ্বকে জানাব, বাংলাদেশ প্রকৃতির সৌন্দর্যে অদ্বিতীয়।

লেখক : আহসানুর রহমান রাজীব, গণমাধ্যম কর্মী

আরও খবর