সাতক্ষীরা

দায়িত্বের ভিড়ে ঈদের আনন্দ, তবুও মানুষের পাশে থাকার তৃপ্তি

  মো. রাজু সিদ্দিকী ১৯ মার্চ ২০২৬ , ৬:৩৮:১৫ অনলাইন সংস্করণ

‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর সেই অমর গান যেন আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, আনন্দের ঈদ ঠিক দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবে আজ ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, আর বাংলাদেশে আগামীকাল। চারদিকে এখন উৎসবের আবহশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগেই ছুটি হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অফিসেও ছুটির আমেজ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নগর ছেড়ে অনেকেই ছুটছেন গ্রামের পথে।
তবে এই আনন্দের মাঝেও আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাছে ঈদ মানেই দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর ত্যাগের গল্প। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্রই যেন তার জীবন্ত উদাহরণ।
চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার কঠিন ধাপ পেরিয়ে শিক্ষানবিশ হিসেবে কর্মরত তরুণ চিকিৎসকদের জন্য ঈদ মানে বাড়ি ফেরা নয়, বরং হাসপাতালের ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন। কারণ অসুস্থতা তো আর উৎসব মানে না ঈদের দিনেও হাসপাতালে ভর্তি থাকে অসংখ্য রোগী, আসে নতুন রোগীও। তাই সেবার এই মহান পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের জন্য ঈদও হয়ে ওঠে কর্মমুখর।
একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক জানান, জীবনের প্রথমবারের মতো তাকে পরিবার ছাড়া ঈদ কাটাতে হচ্ছে। তার কথায়, “চিকিৎসা পেশায় আসার সময়ই জেনেছি, এখানে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এবারের ঈদে পরিবারের অভাব অনুভব করব। কিন্তু রোগীদের পাশে থাকতে পারাটাও এক ধরনের তৃপ্তি দেয়।”
আরেকজন নারী চিকিৎসকের ভাষায়, “ঈদের দিন রোগীদের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে মনে হয় না যে আমি পরিবার থেকে দূরে। কেউ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ঈদ উপহার।”
শুধু চিকিৎসকই ননঈদের দিন ভোর থেকেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আরও অনেক পেশার মানুষ। পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, কারাগারের কর্মী, পরিবহন শ্রমিক সবার নিরলস পরিশ্রমেই সচল থাকে আমাদের জীবনযাত্রা। শহর ফাঁকা হয়ে গেলেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত থাকে পুলিশ। অন্যের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করতে তারা নিজেদের উৎসবকে আড়ালে রেখে দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে, ঈদের আনন্দের মাঝেও সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন গণমাধ্যমকর্মীরা। দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে তাদেরও নেই প্রকৃত ছুটি। অনেকেই পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা কাটান মাঠে কিংবা অফিসে। তাদের কাছে সংবাদ পরিবেশনই যেন ঈদের আনন্দের অন্য নাম।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঈদ শুধু নিজের আনন্দে সীমাবদ্ধ রাখার উৎসব নয়। বরং এটি ভাগাভাগির, সহমর্মিতার এবং মানবিকতার এক অনন্য উপলক্ষ। আমাদের চারপাশে থাকা দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের দিকে সহমর্মিতার হাত বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তাদের পাশে দাঁড়ানো করুণা নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা।
ঈদের কেনাকাটার আনন্দে আমরা যেন তাদেরও অংশীদার করি। সমাজের প্রবীণ, অসহায় কিংবা একাকী মানুষদের খোঁজ নেওয়া এটিও হতে পারে ঈদের বড় একটি ইবাদত। শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাওয়া মানুষের এই চিরায়ত ঐতিহ্য আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। নাড়ির টানে ফিরে যাওয়া, মা-বাবার সান্নিধ্যে ঈদ উদযাপনএসবই আমাদের সংস্কৃতির অমূল্য অংশ, যা সমাজকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। সবশেষে, এই প্রত্যাশা থাকুক ঈদ আমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও মানবিকতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করুক। সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সম্প্রীতি ও অনাবিল আনন্দ। লেখক : সংবাদকর্মী।

আরও খবর