সাতক্ষীরা

ভুয়া আইডির ফাঁদে কিশোরীরা, বাড়ছে সাইবার হয়রানি

  আলী মুক্তাদা হৃদয় ১৩ এপ্রিল ২০২৬ , ৩:৫০:১৬ অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার এক কলেজ শিক্ষার্থী তানিয়া (ছদ্মনাম) সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। কয়েক মাস আগে সে নিজের একটি ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খোলে। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও কিছুদিন পর একটি আইডি থেকে নিয়মিত বার্তা আসতে থাকে। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও পরে সেই ব্যক্তি অনৈতিক প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তানিয়ার ছবির সঙ্গে আপত্তিকর ছবি জুড়ে পাঠানো হয় এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি করা হয়।

তানিয়া প্রস্তাবে রাজি না হলে যুবক মোটা অংকের টাকা দাবি করতে থাকে । তানিয়া মানসিকভাবে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরী ও তরুণী মেয়েদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামের প্রান্তিক পরিবারের মেয়েরা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার বলে জানান সাতক্ষীরা সাইবার ক্রাইম এ্যালার্ট টিমের পরিচালক মাহবুবুল হক।
তিনি বলেন, অনেক মেয়েই জানে না তাদের ছবি কারা ব্যবহার করছে। এসব ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খুলে প্রতারণা করা হচ্ছে মানুষের সাথে। আবার সেই ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত (এআই) ব্যাবহার করে ছবিটি অশ্লীল ভাবে এডিট করে করা বøাকমেইল করা হচ্ছে। তবে একটু সচেতন হলে এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

১৬ বছরের এক কিশোরী বয়সী রিহানা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার ছবি ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি, কেউ ফোন করেছিল অচেনা নাম্বার থেকে। এখন আমার মা-বাবা খুব চিন্তিত। আমরা জানি না কাকে ভরসা করতে হবে।’ তরুনী আরও বলেন, ‘তবে একজনের পরামর্শে থানায় অভিযোগ করেছি।’

থানার পক্ষ থেকে কিশোরীর পরিবারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন কোনো অবস্থাতেই অর্থ লেনদেন না করে, সব প্রমাণ সংরক্ষণ করে এবং আইডিটি রিপোর্ট করে। পরিবার জানায়, পুলিশ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে।

২০ বছর বয়সী ফারিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলোর ছবি আপলোড করি। কিন্তু কেউ সেই ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি বানিয়েছে। লোকজন আমাকে নিয়ে আলোচনা করছে। স্কুলে গিয়ে লজ্জা পাই।’

ফারিয়ার মা জানান, ‘আমরা জানি না কীভাবে অভিযোগ দিই, পুলিশ কি সাহায্য করবে নাকি নয়, তাই ভয় পাই। আমাদের মেয়েকে নিরাপদ রাখতে আমরা অনেককিছুই করতে চাই কিন্তু জানি না কোথা থেকে শুরু করব।’

শিক্ষিকা শিরিন আক্তার বলেন, ‘আমি ক্লাসে মেয়েদের বলি ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখবে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে সচেতনভাবে। সন্দেহ হলে শিক্ষক বা অভিভাবককে জানাবে।’ তিনি নিয়মিত ডিজিটাল আচরণ বিষয়ে আলোচনা করেন, যাতে শিক্ষার্থীরা ভেঙে না পড়ে বরং আইনি পথ বেছে নেয়।
সদর উপজেলার এক কলেজ শিক্ষার্থী অনামিকা তার ছবি ব্যবহার করে খোলা ভুয়া আইডির বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন। পরিবারের সহযোগিতায় প্রমাণ জমা দেওয়ার পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট আইডি বন্ধে পদক্ষেপ নেয় এবং অভিযুক্তকে শনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু করে। পরিবার জানায়, দ্রুত অভিযোগ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এই ঘটনা অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অভিযোগ জানানোর সাহস জুগিয়েছে।

সাতক্ষীরা সাইবার ক্রাইম এ্যালার্ট টিমের পরিচালক শেখ মাহবুবুল হক বলেন, ‘২০২৫ সালে তারা অন্তত ১০০টি অনলাইন হয়রানির অভিযোগ পেয়েছেন, যার একটি অংশ কিশোরী ও কিশোরদের ছবি ব্যবহার সংক্রান্ত। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে পুলিশের কাছে তথ্য হস্তান্তর করা হয়েছে’।
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। কোনো মেয়ের ছবি পেলেই সেটি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া এক ধরনের মানসিক সহিংসতা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিকে এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি নিতে হবে।’ তারা স্কুল-কলেজে সাইবার সচেতনতা কর্মশালা, অনলাইন ক্যাম্পেইন ও কমিউনিটি মিটিং আয়োজন করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময় অনলাইনে ব্লাকমেইলিং, গুজব, সাইবার বুলিং, অপতথ্য সহ ডিজিটাল সচেতনতা কার্যক্রম অব্যহত রেখেছি’।

বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, কারও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি তৈরি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ জানায়, ‘আমরা অভিযোগ পেলে মামলা করতে পারি। তবে শিকারীরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই অনেক সময় ভয় পেয়ে চুপ থাকেন।’

২০২৫ সালে জেলায় অনলাইন হয়রানি সংক্রান্ত ১০০টির অধিক অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ, যার মধ্যে ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডির ঘটনাও রয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে। জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম শাখা জানিয়েছে, ভুক্তভোগীরা নিকটস্থ থানায় জিডি বা মামলা করতে পারেন। পাশাপাশি জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯ অথবা পুলিশ সাইবার সাপোর্টের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমেও অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগের সময় স্ক্রিনশট, লিংক ও সংশ্লিষ্ট নম্বর সংরক্ষণ করা জরুরি।

সাতক্ষীরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাঃ মাসুদুর রহমান বলেন, ‘অনলাইন হয়রানির ঘটনায় ভয় পেয়ে চুপ না থেকে দ্রæত থানায় আসা উচিত। কিশোরী বা কিশোর যে কেউ ভুক্তভোগী হলে আমরা আইনগত সহায়তা দিই। অনেক ক্ষেত্রে দ্রæত ব্যবস্থা নিলে ভুয়া আইডি বন্ধ করা সম্ভব হয়।’

সাতক্ষীরা জজ কোর্টরে নারী ও শিশু ট্রাইবুন্যালের সরকারি কৌশুলি অ্যাডভোকেট শেখ আলমগীর আশরাফ বলেন, কারও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলা বা বিকৃত করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষী প্রমাণিত হলে কারাদÐ ও অর্থদÐ হতে পারে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করার পাশাপাশি ফেসুবকসহ সোস্যাল মিডিয়ায়র প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট অপশন ব্যবহার করবেন। এতে দ্রুত কনটেন্ট অপসারণের সুযোগ তৈরি হয়।

অ্যাডভোকেট আলমগীর আশরাফ বলনে, কেউ ভুয়া আইডি খুলেছে কি না বুঝতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে প্রোফাইলে অস্বাভাবিক নাম বা বানান ভুল, খুব কম বন্ধু বা সদ্য খোলা অ্যাকাউন্ট, নিজের ছবি ব্যবহার হলেও অন্য তথ্য ভিন্ন থাকা, ইনবক্সে অযাচিত বার্তা বা অর্থ দাবি এসব লক্ষণ থাকলে সেটি ভুয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে প্রোফাইলের লিংক কপি করে স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে থানায় জিডি বা অভিযোগ করা যেতে পারে।

সাতক্ষীরা মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, “অনলাইন নিরাপত্তা মানে শুধু পাসওয়ার্ড গোপন রাখা নয়; বরং নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও যোগাযোগ সীমিত রাখা, অপরিচিত কারও অনুরোধ যাচাই ছাড়া গ্রহণ না করা এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকের সেই কন্টেটে রিপোর্ট করা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সচেতন আচরণ না করলে খুব সহজেই কেউ হয়রানির শিকার হতে পারে।”
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এক বছরে সাতক্ষীরার কমপক্ষে ৫০ এর অধিক কিশোরী ও তরুণীর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি তৈরি হওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ভিকটিম হচ্ছে প্রান্তিক পরিবারের মেয়েরা।

তিনি আরও বলেন, সচেতনতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে কর্মশালা, অভিভাবক সমাবেশ ও কিশোরী ক্লাবের বৈঠকে অনলাইন নিরাপত্তা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, দ্বৈত যাচাইকরণ পদ্ধতি চালু করা এবং অপরিচিতদের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো কিশোরী ভয় পেলে প্রথমে বিশ্বস্ত একজন বড় মানুষ মা-বাবা, অভিভাবক, স্কুলের শিক্ষককে জানাবে। প্রয়োজনে নিকটস্থ থানার নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্কে যোগাযোগ করা যাবে। জরুরি সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯-এ ফোন করা যায়। এছাড়া সরকারি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন ১০৯-এ কল করেও পরামর্শ নেওয়া সম্ভব।

নাজমুন নাহার বলেন, কেবল কিশোরী নয়, কিশোররাও এ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে । একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, কিশোরদের ছবিও বিকৃত করে ভুয়া আইডি খুলে অর্থ দাবি করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ছেলে বা মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই একই আইনি সহায়তা প্রযোজ্য।

প্রান্তিক এলাকার কিশোরী ও তাদের পরিবারকে সচেতন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওগুলো কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন : ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য অচেনাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন না। ভুয়া আইডি দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া রিপোর্টিং অপশন ব্যবহার করুন। পুলিশ বা স্থানীয় নারী ও শিশু কল্যাণ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করুন। পাসওয়ার্ড নিয়মিত পরিবর্তন করুন এবং কাউকে শেয়ার করবেন না। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেয়েদের অনলাইন আচরণ ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করুন।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইন হয়রানির ঘটনায় প্রমাণ সংরক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব পায়। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ জানায়, অভিযোগ পেলে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আইডির উৎস শনাক্তের চেষ্টা করা হয় এবং প্রয়োজন হলে মামলা রুজু করা হয়।

আরও খবর