আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৮ এপ্রিল ২০২৬ , ৫:২৪:৪৫ অনলাইন সংস্করণ
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় আবহাওয়া ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্যে। দিনের বেলা অতিরিক্ত তাপদাহ, রাতের দিকে হঠাৎ ঠান্ডা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতার তারতম্য এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট সব মিলিয়ে শিশুদের মধ্যে সর্দি-জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো রোগ দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার নিচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ১৭০ শিশু এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৬০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডে ৫০ জন এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১৮ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চরম চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, শয্যার অভাবে অনেক অভিভাবক অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দা কিংবা মেঝেতেই অবস্থান করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান আবহাওয়ায় শিশুদের নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাই শিশুর জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা পাতলা পায়খানা শুরু হলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। শিশুকে হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডা বা ঠান্ডা থেকে গরম পরিবেশে নেওয়া উচিত নয়। নিরাপদ ও ফুটানো পানি ছাড়া কিছু খাওয়ানো যাবে না এবং খাবারের আগে-পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ধুলাবালি ও দূষণ এড়িয়ে চলা, প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা করা হলে নিউমোনিয়া দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আবহাওয়ার এই অস্থিরতায় শিশুদের অসুস্থতা আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত বাড়ছে। তালা উপজেলার নগরঘাটা গ্রামের আবু রায়হান জানান, দিনের প্রচণ্ড গরম আর রাতের ঠান্ডার কারণে তাঁর শিশুর সাধারণ জ্বর দ্রুত শ্বাসকষ্টে রূপ নেয়। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান তালতলা এলাকার শরিফুল ইসলাম ও সদর উপজেলার রফিকুল ইসলাম। তাঁরা বলেন, আগে যেসব অসুখ সহজে সামাল দেওয়া যেত, এখন সেগুলো দ্রুত জটিল হয়ে যাচ্ছে।
বিশুদ্ধ পানির সংকটও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। গৃহবধূ রিনা খাতুন বলেন, গরমের কারণে পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা থেকে ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। লাবসা গ্রামের হাসান আলীর ভাষ্য, গ্রামের বহু পরিবার এখনও বিষয়টির গুরুত্ব না বোঝায় চিকিৎসা নিতে দেরি করছে, এতে শিশুর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াদ হাসান বলেন, দিনের অতিরিক্ত গরম ও রাতের ঠান্ডা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামছুর রহমান জানান, আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে এসব রোগ দেখা গেলেও এখন সারা বছরই একই ধরনের রোগী আসছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির সংকটের কারণে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেবা কার্যক্রম জোরদার করেছে, তবে এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

















