আলী মুক্তাদা হৃদয় ১২ মে ২০২৬ , ৫:৩৭:৩৭ অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু সংকটের অঞ্চল হিসেবে। একসময় যেখানে কৃষকেরা ধান চাষ ছেড়ে চিংড়িঘেরের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেখানে এখন আবারও বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দুলছে সোনালি বোরো ধান। প্রতিকূল আবহাওয়া, মাটির উচ্চ লবণাক্ততা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা মোকাবিলা করেও চলতি মৌসুমে শ্যামনগরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে নতুন আশার আলো দেখছেন উপকূলের কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৭১৫ হেক্টর জমি। তবে কৃষকদের আগ্রহ ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এবার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন পাওয়া গেছে ৬ দশমিক ৫ মেট্রিক টন ধান, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। গত বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৬ দশমিক ৩ মেট্রিক টন।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং কৃষকদের অভিযোজন ক্ষমতা এবার ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
জলবায়ুর সঙ্গে যুদ্ধ করেই বোরো চাষ
শ্যামনগরের কৃষকদের জন্য বোরো আবাদ কখনোই সহজ ছিল না। শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। খাল-বিলে মিষ্টি পানির সংকট দেখা দেয়। অনেক এলাকায় সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। আবার মৌসুমের শেষদিকে কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি থাকে।
তারপরও উপজেলার রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ, কাশিমাড়ী, কৈখালী ও ভুরুলিয়া ইউনিয়নের মাঠজুড়ে এবার দেখা গেছে বোরো ধানের বিস্তীর্ণ আবাদ। এসব এলাকায় ব্রি-৬৭, ব্রি-৯৯ ও এসএল-০৮ জাতের ধানের আবাদ বেশি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি এখন পুরোপুরি জলবায়ু নির্ভর হয়ে পড়েছে। তারপরও কৃষকরা নতুন প্রযুক্তি ও লবণসহিষ্ণু জাত ব্যবহারের মাধ্যমে ভালো ফলন পাচ্ছেন। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনও বেড়েছে।’
লবণাক্ততা কমলে বাড়ে আশার আলো
উপকূলীয় এই অঞ্চলে বোরো আবাদ মূলত নির্ভর করে শুষ্ক মৌসুমে কতটা মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছে তার ওপর। কৃষকরা বলছেন, এ বছর খাল ও জলাশয়ে তুলনামূলক বেশি পানি থাকায় সেচ সুবিধা কিছুটা ভালো ছিল। একই সঙ্গে রোগবালাইও কম হওয়ায় ফলন বেড়েছে।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আগে লবণের কারণে ধান ঠিকমতো হতো না। এখন নতুন জাতের ধান লাগাই। এ বছর প্রতি বিঘায় ১৪ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ধান পেয়েছি।’
কৈখালীর কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বছরের পর বছর লবণ আর দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে।’
শিলাবৃষ্টির আঘাত, তবু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে উপজেলার কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ১৭ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষকের জমির ধান পানিতে পড়ে যায়।
রমজাননগর এলাকার কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, ‘শিলাবৃষ্টিতে আমার তিন বিঘার মধ্যে দুই বিঘার ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে অন্য জমির ফলন ভালো হওয়ায় কিছুটা সামলে নিতে পেরেছি।’
কৃষি বিভাগ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন আবহাওয়ার আচরণ অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কখন ঝড়, কখন অতিবৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হবে তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষকদের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সাফল্যের গল্প: লবণাক্ত জমিতে বদলে গেছে কৃষক আজিবরের জীবন
শ্যামনগরের ভুরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষক আজিবর রহমান কয়েক বছর আগেও ধান চাষ নিয়ে হতাশ ছিলেন। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফলন কম হতো। লোকসান গুনতে গুনতে একসময় ধান আবাদ বন্ধ করার কথাও ভেবেছিলেন।
পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি লবণসহিষ্ণু ব্রি-৬৭ জাতের ধান আবাদ শুরু করেন। পাশাপাশি জমিতে জৈব সার ব্যবহার, সঠিক সময়ে সেচ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
আজিবর রহমান বলেন, ‘আগে মনে হতো এই জমিতে আর ধান হবে না। কৃষি অফিস থেকে পরামর্শ নেওয়ার পর নতুনভাবে চাষ শুরু করি। এবার প্রতি বিঘায় আগের চেয়ে অনেক বেশি ধান পেয়েছি। এখন আবার সাহস ফিরে পেয়েছি।’
তিনি জানান, ভালো ফলন হওয়ায় এবার সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচও সহজে চালাতে পারবেন।
কৃষি বিভাগ কি সবাইকে সাহায্য করছে?
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সব কৃষক একসঙ্গে সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগও রয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লবণসহিষ্ণু বীজ, কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে নিয়মিত তদারকিও করছেন কর্মকর্তারা।
শ্যামনগরের কৃষক গৌতম মন্ডল বলেন, ‘আগে আমরা বুঝতাম না কোন জাতের ধান লাগালে ভালো হবে। এখন কৃষি অফিসের লোকজন মাঠে এসে পরামর্শ দেন। এতে উপকার হচ্ছে।’
তবে কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, সব কৃষক এখনো সরকারি সহায়তার আওতায় আসতে পারেননি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক কৃষক সময়মতো তথ্য পান না।
সরকারি অনুদান কিভাবে পাওয়া যাবে?
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা পেতে হলে কৃষকদের স্থানীয় কৃষি অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হয়।
সহায়তা পেতে করণীয়-
১. উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে কৃষক নিবন্ধন করতে হবে।
২. জমির পরিমাণ ও চাষাবাদের তথ্য জমা দিতে হবে।
৩. কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে।
৪. লবণসহিষ্ণু জাত ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহ দেখাতে হবে।
৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রদান করতে হবে।
কৃষি বিভাগ জানায়, সরকারি সহায়তা সরাসরি নগদ অর্থ হিসেবে না দিয়ে সাধারণত বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ আকারে দেওয়া হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে উপকূলের কৃষি
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্যামনগরের বড় অংশজুড়ে শুধু চিংড়ি চাষই বেশি হতো। কারণ অতিরিক্ত লবণাক্ততায় ধান চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন কৃষি বিভাগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন এবং অভিযোজন কৌশল ব্যবহারের ফলে আবারও ধান চাষে ফিরছেন কৃষকরা।
উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন মন্ডল জানান, ‘মাঠের প্রায় ৯০ শতাংশ ধান কৃষকেরা ইতোমধ্যে ঘরে তুলেছেন। যদি শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সুন্দরবন সংলগ্ন এই অঞ্চলে বোরো আবাদ আরও বাড়ানো সম্ভব।’
প্রতিরোধের উপায়: কীভাবে কমবে ঝুঁকি?
কৃষিবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারনের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে অভিযোজনভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ব্যবহার, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের এখন আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষ করতে হবে। সময়মতো বীজতলা তৈরি, সঠিক সময়ে রোপণ ও পানি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধের উপায়গুলো হলো-
১. লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ব্যবহার করতে হবে।
২. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচে ব্যবহার করতে হবে।
৩. জমিতে জৈব সার প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
৪. নিয়মিত মাটি ও পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করতে হবে।
৫. খাল ও জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে।
৬. আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করে ধান কাটতে হবে।
৭. ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকায় শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নিশ্চিত করতে হবে।
৮. কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
৯. খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা
সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে। গত ৩ মে থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রতি কেজি ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা। উপজেলায় ২৭৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সদর ও নওয়াবেঁকী খাদ্য গুদামে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো চাষ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
অভিযোজনই এখন উপকূলের বাঁচার পথ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সাতক্ষীরার উপকূল আজ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হচ্ছে এখানকার মানুষকে। কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষকরা এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।
শ্যামনগরের কৃষক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আগে ভাবতাম এই এলাকায় আর ধান হবে না। এখন আবার মাঠে ধান দেখলে সাহস পাই। যদি পানি আর সহায়তা ঠিকমতো পাই, তাহলে আরও বেশি চাষ করব।’
প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেও শ্যামনগরের কৃষকরা প্রমাণ করেছেন সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও সাহস থাকলে উপকূলের মাটিতেও আবার সোনালি ধান হাসতে পারে।

















