আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৮ আগস্ট ২০২৫ , ৫:৫৬:৪৪ অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই জনপদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষ বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী গত ১৫ বছরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কামালনগর, গড়েরকাঁন্দা, সুলতানপুর বস্তিতে, কেউ ভাড়া বাসায়, আবার কেউ ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মানুষগুলো কেন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে? শহরে এসে তারা কোন ভোগান্তির মুখে পড়ছে? শহরের অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব কী? আর এর সবকিছুর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক কতটা গভীর? বিশেষজ্ঞরা বলছেন টেকসই বাঁধ, সাইক্লোন শেল্টার ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে পারলে মোকাবেলা সম্ভব।
উপকূল থেকে শহরে আসার গল্প
বুড়িগোয়ালিনীর নাজমা খাতুন (৩৫) এখন বিনেরপোতা বস্তিতে থাকেন। তার কাহিনি যেন উপকূলবাসীর এক প্রতিনিধি চিত্র। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। স্বামী ৬ বছর আগে মারা যায়। তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি শহরে চলে আসেন। এখন স্থানীয় একটি ইটভাটায় দিনমজুরি করেন।
নাজমা খাতুন বলেন “আমাদের গ্রামে আর কিছু নাই। জমি লোনা হয়ে গেছে, ধান হয় না। দুইবার ঘর বানাইছি, দুইবারই নদী খাইছে। তাই বাধ্য হইয়া শহরে আসছি। এখানে কাজ পাইছি, কিন্তু ভাড়া আর ড্রেনের গন্ধে বাঁচা দায়। আবার পানি কিনতে হয়।”
আশাশুনির প্রতাপনগরের রফিকুল ইসলাম (৪৫) এখন কামালনগর বস্তিতে থাকেন। আগে তার ৪ বিঘা জমি ছিল। সিডর ও আইলার পর সেই জমি লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। এখন তিনি শহরে রিকশা চালান।
“জমি হারাইছি, ঘর হারাইছি। গ্রামে আর কিছু নাই। শহরে আসছি কামাই করার জন্য। কিন্তু শহরেও শান্তি নাই বাচ্চা অসুস্থ হয়, ডাক্তার দেখাতে গেলে খরচ সামলাই না।”
শ্যামনগরের কৈখালী গ্রামের তরুণ রুবেল (২২) ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করেন। তার পরিবার বিনেরপোতা বস্তিতে থাকে। “গ্রামে নদী ভাঙনে আমাদের ঘর শেষ। এখন মা-বাবা শহরে থাকে, আমি ঢাকায় কাজ করি। গ্রামে ফেরা মানেই দুর্যোগের ভয়।”
শহরের ওপর নতুন চাপ : সাতক্ষীরা শহরে হঠাৎ করে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল নতুন ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে। শহরের বস্তি এলাকা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সাধারণ নাগরিক জীবনের ওপর এর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাসস্থান সংকট : গত এক দশকে শহরে নতুন বস্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কামালনগর, গড়েরকাঁন্দা, সুলতানপুর, বাঁকাল, বিনেরপোতা সহ অন্তত ১৫টি বস্তি গড়ে উঠেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে বস্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শহরের বাসস্থান সমস্যাও তীব্র হয়ে গেছে। ভাড়া বাড়ি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা শহরের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে বাস্তুচ্যুতরা শহরে এসে আশ্রয় নিচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শহরে জায়গার অভাবে তারা নিজেদের জীবনযাত্রা ঠিকভাবে বজায় রাখতে পারছে না।
পানি সংকট : শহরের দৈনিক পানির চাহিদা গড়ে ৪৫ মিলিয়ন লিটার হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন লিটার। ফলে বস্তিবাসীদের বড় অংশকে চড়া দামে পানি কিনতে হয়। শহরের পুরনো টিউবওয়েল ও পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় পানি ক্রমেই অপর্যাপ্ত হচ্ছে। পাশাপাশি, অনেক বস্তিতে পানি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নেই, যার ফলে সংক্রমণ ও জলজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি : অপরিকল্পিত বসতি, নোংরা ড্রেন এবং জমে থাকা পানি শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। চর্মরোগ, ডায়রিয়া, জন্ডিস, ডেঙ্গু এবং শ্বাসসংক্রান্ত অসুখের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, “বস্তি এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই, এবং পানি দুর্যোগজনিত কারণে অস্বাস্থ্যকর। ফলে শিশুদের অপুষ্টির হার ক্রমেই বাড়ছে।”
শিক্ষার চাপ : শহরের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষক ও ক্লাসরুমের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী সামলাতে গিয়ে স্কুলের মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
নাগরিক বিরক্তি : স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অপরিকল্পিত বস্তি তৈরি হওয়ায় রাস্তা দখল হচ্ছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। তারা দাবি করছেন, শহরের পরিবেশ এবং নাগরিক নিরাপত্তা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা জানি তারা কষ্টে এসেছে, কিন্তু শহরের জন্যও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যদি পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, শহর আরও অশান্ত ও অস্থির হয়ে উঠবে।”

সমাধানের দিক নির্দেশনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের ওপর চাপ কমাতে উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা মানুষদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসন কলোনি গড়ে তোলা জরুরি। শহরের পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নাগরিক সেবা উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এই সংকট সামলানো সম্ভব নয়। এছাড়া শহরের অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সঠিকভাবে সামলানো যায়।
উপকূল থেকে আসা মানুষদের শহরে আগমন একদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি, অন্যদিকে শহরের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই দুই দিকের সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন “আমরা জানি তারা কষ্টে আসে। কিন্তু শহর ভরে গেছে। রাস্তা, ড্রেন সব জায়গায় চাপ বেড়ে গেছে। সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে জায়গা না দেয়, তাহলে শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আ.ন.ম গাউছার রেজা ব্যাখ্যা করে বলেন, “সাতক্ষীরা উপকূল হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্টলাইন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সরাসরি মানুষের জীবিকা ও বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছে। এই কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে চলে আসছে। এটিই ‘ক্লাইমেট মাইগ্রেশন’। আগামী ২০ বছরে যদি সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া যায়, শুধু সাতক্ষীরা নয়, সমগ্র বাংলাদেশের উপকূলে কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।”
সাতক্ষীরা পৌরসভার সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে গত ১৫ বছরে ৫০ হাজার মানুষ শহরে চলে এসেছে। এর মধ্যে ৬০% পরিবার বস্তিতে থাকে। প্রায় ২০% পরিবার ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টস খাতে কাজ করছে। ৪০% পরিবার গ্রাম ও শহরের মাঝে দোদুল্যমান জীবন কাটাচ্ছে দুর্যোগে শহরে আসে, শান্ত হলে আবার গ্রামে ফিরে যায়।
আশাশুনির প্রতাপনগর থেকে আসা বাঁকাল ইসলামপুর বস্তির হালিমা খাতুন বলেন “আমার বাড়ি ছিল আশাশুনির প্রতাপনগরে। বাবা-দাদার জমি ছিল তিন বিঘা। ধান, শাকসবজি চাষ করতাম। আমরা কষ্ট করে হলেও খেতে পারতাম। কিন্তু নদীর বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে জমি সব নষ্ট করে দিল। ধান আর ফলল না, বাড়ির চারদিকে পানিই পানি। তখন থেকেই আমাদের কষ্ট শুরু।
তিনি আরও বলেন প্রথমে ভেবেছিলাম পানি নামবে, আবার আগের মতো চাষাবাদ করব। কিন্তু এক বছর, দুই বছর, তারপর তিন বছর কেটে গেল জমি আর ফসল দিল না। তখন স্বামী দিনমজুরি করত। ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র পর আমাদের ঘর ভেঙে যায়, তখনকার সেই রাতটা কোনোদিন ভুলতে পারব না। বুকভরা পানি, ঝড়ের শব্দ, ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে আমি মরার মতো বেঁচেছিলাম।

মোঃ আজিজুল গাজী, “আমার বাড়ি ছিল শ্যামনগরে। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে শহরে এসে কামালনগর বস্তিতে উঠেছি। এখানে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু কষ্ট যেন কমে নাই, বরং নতুন কষ্ট শুরু হয়েছে। আমার ছোট ছেলেটার হাঁপানি হয়েছে। চারপাশে ড্রেনের গন্ধ, ময়লা পানিÍ এগুলোর জন্য ওর শ্বাসকষ্ট দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। রাতের পর রাত কাশতে কাশতে ঘুমাতে পারে না। ডাক্তার দেখাতে টাকা লাগে, সেটা সব সময় জোগাড় করতে পারি না। বস্তির পরিবেশে সুস্থভাবে থাকা যায় না, কিন্তু গ্রামের বাড়ি তো নদী খাইছে, ফেরার উপায়ও নেই।”
শ্যামনগরের যুবক রুবেল জানান, “আমি শ্যামনগরের কৈখালী গ্রামের ছেলে। ঘূর্ণিঝড় আর নদী ভাঙনে আমাদের ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে। তাই পরিবার নিয়ে সাতক্ষীরা শহরে আসতে হয়। এখন তারা বিনেরপোতা বস্তিতে থাকে। আমি ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করি, মাসে যা পাই তার বেশিরভাগই বাড়িতে পাঠাই। কিন্তু মন সবসময় অস্থির থাকেÍ মাকে বস্তির ভেতর রোগ-শোকে কষ্ট পেতে দেখি, ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না। দূরে থেকে তাদের কষ্টের কথা চিন্তা করলেই বুক ভেঙে যায়। মনে হয়, নিজের গ্রাম যদি বাঁচতো, তবে এভাবে আমাদের ছড়িয়ে পড়তে হতো না।”
শহরবাসীর অভিযোগ
সাতক্ষীরা শহরের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শহরে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য নতুন বস্তি গড়ে ওঠার ফলে শহরের পরিবেশ ও নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে। “অপরিকল্পিতভাবে বস্তি গড়ে উঠায় রাস্তা দখল হয়ে গেছে। রিকশা, অটো, সাধারণ যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে,” জানিয়েছেন এক স্থানীয় ব্যবসায়ী। তিনি আরও যোগ করেন, “রাস্তা সংকট শুধু যানজট নয়, জরুরি সেবার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারছে না।”
বস্তির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও বড় সমস্যা। স্থানীয়দের মতে, জমে থাকা নোংরা পানি, আবর্জনা ও ড্রেনের দুর্গন্ধের কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, ডেঙ্গু ও শ্বাসজনিত অসুখ বেড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এক স্কুল শিক্ষক বলেন, “বস্তি এলাকায় অসুস্থতার প্রকোপ বাড়ায় স্কুলেও উপস্থিতি কমছে। শিশুরা ক্লাসে নিয়মিত আসছে না।”
এছাড়া, কিছু এলাকায় অপরাধমূলক কার্যক্রম বেড়েছে। চুরি, লুটপাট ও ছোটখাটো সংঘাত বাড়ার কারণে স্থানীয়দের নিরাপত্তা বোধ কমেছে। তারা দাবি করছেন, সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও শহরের অবকাঠামোর উন্নয়ন না হলে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে।
স্থানীয়রা এককথায় বলছেন, “আমরা বুঝি তারা কষ্টে এসেছে, কিন্তু শহরের জন্যও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।”
সিডো’র প্রধান নির্বাহী শ্যামল কুমার বিশ্বাস বলেন, “সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে গ্রামে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আসছে।
আমাদের এক জরিপে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাঁকাল ইসলামপুর বস্তিতে প্রায় ৭ হাজার মানুষ বসবাস করে। কেউ শহরে এসে জমি কিনে বাড়ি করেছে। কেউ দরিদ্র হওয়ার কারণে বস্তিতে বসবাস করছে। আমাদের জরিপ ও কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শহরে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া বস্তি ও অপরিকল্পিত বসতি শুধু বাসস্থান সমস্যাই নয়, বরং পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে সংকটেরও সৃষ্টি করছে।”
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আ.ন.ম গাউছার রেজা কয়েকটি করণীয় পরামর্শ দিয়েছেন। উপকূল রক্ষা: টেকসই বাঁধ, সাইক্লোন শেল্টার ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিকল্প জীবিকা: গ্রামে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবেÍ কৃষি, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা। শহরে পরিকল্পিত পুনর্বাসন: এলোমেলো বস্তির বদলে আলাদা কলোনি করে স্বাস্থ্য, পানি, শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো: শহরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আলাদা সুবিধা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: জলবায়ু তহবিল থেকে বরাদ্দ এনে উপকূল রক্ষায় ব্যবহার করতে হবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় মানুষ জীবিকার তাগিদে শহরে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শহরের ওপর বাড়ছে চাপ। তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল।”
সাতক্ষীরার উপকূল থেকে শহরে মানুষের এই স্থানান্তর কোনো স্বেচ্ছা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়াস। তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে শুধু দুর্যোগ থেকে বাঁচতে, কিন্তু শহরে এসে আবার নতুন সংকটে পড়েছে।
এটা জলবায়ু পরিবর্তনের এক নগ্ন বাস্তবতা যা প্রমাণ করছে জলবায়ু শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের সমাজ ও জীবনকেও পাল্টে দিচ্ছে।
এখন সময় এসেছে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক দাতাদের একসঙ্গে কাজ করার। উপকূলকে টেকসই না করলে শহরও টিকবে না। আর শহরকে পরিকল্পিতভাবে না গড়লে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষ শুধু নতুন দুর্যোগ ডেকে আনবে।

















