নিজস্ব প্রতিনিধি ১১ অক্টোবর ২০২৫ , ৩:০৭:১২ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরায় নীরবে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে অনলাইন জুয়া নামের মহামারী। মোবাইল ফোনে অ্যাপ আর ইন্টারনেটের ছোঁয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে এই নতুন প্রজন্মের ধ্বংসের নেশা। রাতভর চলে বেটিং, বাজি আর টাকার লেনদেন। হারের পর ভোরে কেবল হাহাকার, কান্না আর কারো ভাঙে সংসার। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন বিকাশ, নগদ, রকেট সহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংককিং চ্যানেলে বয়ে যাচ্ছে জুয়ার টাকা। আর এসব চক্রের সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন অসাধু মোবাইল ব্যাংককিং এর এজেন্টরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলাতেই এখন অনলাইন জুয়ার জাল ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এর ভয়াবহতা আশাশুনি ও শ্যামনর ও সাতক্ষীরা সদর এর বেশি। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি টাকার কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়া তরুণদের আড্ডায়ও চলছে জুয়া নিয়ে আলোচনা।
‘ক্রিকেট বেট’, ‘ক্যাসিনো গেম’, ‘টিনপট্টি’, ‘ব্লাষ্ট’, ‘এভিয়েটর’, ‘রুলেট’ এসব অ্যাপে বাজি ধরছে কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই।
কালিগঞ্জ উপজেলার এক ভুক্তভোগী বলেন, “প্রথমে মজা করে খেলতে নামি। দু’বার জেতায় লোভ বাড়ে। এরপর যত টাকা হাতে পাই, সব শেষ। এখন স্ত্রীর গহনা বিক্রি করেছি, ঋণ নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। সংসারটা একদম ভেঙে গেছে।”
আরেক ভুক্তভোগীর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “স্বামী এখন ঘরে ফেরে না। বেটিংয়ের টাকায় ঋণ হয়েছে। আমি সন্তান নিয়ে অভুক্ত দিন কাটাচ্ছি।”
এই চিত্র শুধু এক পরিবারের নয় পুরো সাতক্ষীরা জেলার অসংখ্য পরিবার এখন একই কথা বলে।
সাতক্ষীরা শহরের ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই অনলাইন জুয়া সমাজে মরণব্যাধি হয়ে গেছে। অনেক তরুণ দোকান বিক্রি করেছে, কেউ আত্মহত্যা ভাবছে। এখনই থামাতে না পারলে আগামী প্রজন্ম হারিয়ে যাবে।”
তালা উপজেলার এক শিক্ষক জানান, “প্রতিদিন ছাত্রদের মোবাইল বাজেয়াপ্ত হচ্ছে। তারা বই নয় বেটিং সাইটে ডুবে আছে। নৈতিক পতন এখন ভয়ানক পর্যায়ে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জুয়াড়ী জানান, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে যে লেনদেন চলছে, তা অনেক সময় নিরাপদ নয়। বিকাশ, নগদ এবং অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে টাকা পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশ সময় আমরা জানি না টাকা কোথায় যাচ্ছে। অনেক এজেন্ট প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে লেনদেন দেখায়, কিন্তু খেলোয়াড়ের টাকা হঠাৎ ‘লক’ হয়ে যায় বা কেউই টাকা ফেরত দেয় না। মানুষ প্রথমে ছোট পরিমাণ বাজি দেয়, কিন্তু হঠাৎ বড় টাকা হারিয়ে নষ্ট হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এজেন্টরাও দায় এড়িয়ে যায়। যদি কেউ সতর্ক না হয়, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থই নয়, সমাজের নৈতিকতা এবং তরুণ প্রজন্মকেও ধ্বংস করছে।”
তবে এসব অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর সম্প্রতি সময়ে জেলার গোয়েন্দা (ডিবি) ও সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে বেশ কয়েকজন জুয়াড়ি গ্রেফতার হয়েছে। পুলিশ বলছে, শুধু গ্রেফতার নয়, মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে চলছে তদন্ত।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাচ্ছি। অনেক সময় এরা ভুয়া আইডি ও পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে টাকা পাচার করে। আমরা এখন প্রতিটি লেনদেন বিশ্লেষণ করছি। অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।”
সমাজকর্মী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন তরুণদের অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। প্রথমে কিছু টাকা জিতলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, তারপর শুরু হয় ঋণ, প্রতারণা, এমনকি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।
হৃদয় বার্তা’র সম্পাদক জি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই জুয়া সংক্রান্ত ঘটনার খবর আসে। এটা শুধু পুলিশের বিষয় নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও মিডিয়া সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
মেহেরপুর জেলার দুই অনলাইন জুয়ার হোতা আটকের পর (১১ অক্টোবর) সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, “অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণার বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সমাজের যুবসমাজকে এ ধরনের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে এবং সকল অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

















