শ্যামনগর

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা

  এম কামরুজ্জামান, শ্যামনগর ব্যুরো ২০ মে ২০২৬ , ২:৩০:৪১ অনলাইন সংস্করণ

একসময় গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধি আর স্বচ্ছলতার প্রতীক ছিল ধানের গোলা। কৃষকের বাড়ির আঙিনায় উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশ ও চটা দিয়ে তৈরি গোলাকৃতির গোলা যেন জানান দিতো পরিবারের কৃষি নির্ভর ঐতিহ্যের কথা। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চিরচেনা ধানের গোলা এখন বিলুপ্তির পথে। সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ধানের গোলা আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

কয়েক যুগ আগেও গ্রামের অধিকাংশ কৃষক পরিবারের বাড়িতে ধান সংরক্ষণের জন্য থাকতো গোলা ঘর। নতুন ধান উঠলে সেই গোলা ভরে উঠতো সোনালি ফসলে। এমনকি একসময় বিয়ের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও বরপক্ষের বাড়িতে ধানের গোলা আছে কিনা, তা খোঁজ নিত কন্যাপক্ষের লোকজন। কারণ ধানের গোলা ছিল পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও কৃষি সমৃদ্ধির পরিচয়।

প্রবীণদের ভাষ্য, আগে গ্রামের দক্ষ কারিগররা বাঁশ ও চটা দিয়ে গোল আকৃতির গোলা তৈরি করতেন। গোলাগুলো মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে বসানো হতো, যাতে বন্যা বা ইঁদুরের আক্রমণ থেকে ধান রক্ষা পায়। গোলার উপরে থাকতো টিন কিংবা খড়ের তৈরি পিরামিড আকৃতির ছাউনি। ধান রাখার জন্য ছোট একটি মুখ থাকতো গোলার উপরের দিকে, যেন সহজে চুরি করা না যায়। শুকনো ধান সেই মুখ দিয়ে গোলার ভিতরে সংরক্ষণ করা হতো।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সংরক্ষণ পদ্ধতি। এখন অধিকাংশ কৃষক ধান গোলায় না রেখে বস্তাভর্তি করে পাকা গুদাম ঘরে রাখছেন অথবা সরাসরি আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে ধানের গোলার ব্যবহার কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

এদিকে গোলা তৈরির কারিগরদেরও এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। পেশার চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে কোথাও পুরোনো গোলা নষ্ট হলে তা সংস্কার করার লোকও মিলছে না। অনেক পরিবার তাদের পুরোনো গোলা ভেঙে ফেলেছে। আবার কেউ কেউ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখনো আগলে রেখেছেন পূর্বপুরুষদের সেই ঐতিহ্য।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মোড়ল বাড়ির কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, “আমার দাদা, পরে বাবা-চাচারা ধানের গোলায় ধান রাখতেন। এখন আর সেই চল নেই। আমরা শুধু স্মৃতি হিসেবে গোলাটা রেখে দিয়েছি। এখন ধান বস্তায় ভরে গুদাম ঘরে রাখা হয়।”

গ্রাম বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষিভিত্তিক জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ধানের গোলা। কিন্তু আধুনিক গুদাম ব্যবস্থা, পরিবর্তিত জীবনধারা ও প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য। ফলে আগামী প্রজন্মের কাছে ধানের গোলা হয়তো শুধুই গল্প কিংবা বইয়ের পাতার একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে।

আরও খবর