আলী মুক্তাদা হৃদয় ১০ মে ২০২৫ , ৪:৩৮:৩৫ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরাসহ সারাদেশে মৃদু থেকে মাঝারি, কোথাও কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে স্বভাবতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। বিশেষজ্ঞরা মানুষকে, বিশেষ করে অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু জীবিকার তাগিদে মানুষকে বাইরে বের হতেই হচ্ছে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সাতক্ষীরাসহ এর পার্শ্ববর্তী জেলায় মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এটিও একটি আংশিক তাপপ্রবাহ, মানে এই তাপপ্রবাহে সারাদেশে তাপপ্রবাহ থাকবে না, তবে তাপপ্রবাহ আক্রান্ত স্থানে তাপমাত্রা ৪০ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হতে পারে। তবে তা অনুভূত হতে পারে আরও বেশি ।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস যা বলছে:
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, আগামী কয়েকদিন মাঝারি তাপপ্রবাহ হতে পারে, সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়, এই সকল এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি থেকে ৩৮ডিগ্রি সেলসিয়াস এর আশেপাশে উঠে যেতে পারে।
তাপপ্রবাহ চলাকালীন সময়ে তাপপ্রবাহ আক্রান্ত এলাকা গুলোতে বৃষ্টির পরিমান অনেক হ্রাস পেতে পারে, তারপরও আকস্মিকভাবে বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে যায়।
সাতক্ষীরা শহরের ভ্যানচালক রিজভী আহমেদ বলেন, হঠাৎ গরম বেশি লাগছে। যাত্রীও কম। ভ্যান চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
পুষমিতা আক্তার রিমি নামে এক গৃহিণী বলেন, প্রচুর গরম। রান্নাঘর তেতে আছে। বৃষ্টি হলে ভালো হয়।
গরমের আলাই-বালাই:
গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে হিটস্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা থাকে, বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, যাদের হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের। এছাড়া ঊষ্ণ আবহাওয়ার কারণে সর্দিজ্বর এবং ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। ইতোমধ্যেই সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর চাপ বেড়েছে। জানা গেছে, প্রচন্ড দাপদাহে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালসহ বেসরকারি হাসপাতালে ভিড় করছে। শিশু হাসপাতালেও ভিড় বাড়ছে শিশু রোগীদের।
যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে শিশু, বেশি বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র তথা অপুষ্ট জনগোষ্ঠীর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। তারা রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে শ্রমের বিনিময়ে যে টাকা রোজগার করে, তাই দিয়েই তাদের পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আর এ সময় তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রত্যেক সামর্থ্যবানের উচিত এই তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা, তাদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে সবারই হাঁসফাঁস অবস্থা। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে বা শারীরিক পরিশ্রম করলে যে কেউ অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। কোনো কারণে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রির বেশি হয়ে গেলে মানুষের রক্তচাপ কমে যায়, এমনকি অচেতনও হয়ে পড়তে পারে। এ সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘হিট স্ট্রোক’ বলে। যথাসময়ে চিকিৎসা না করলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
স্বাভাবিকভাবে আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে শরীরের রক্তনালি প্রসারণের মাধ্যমে অথবা ঘামের মাধ্যমে তাপ হারায় ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। প্রচন্ড গরমে দীর্ঘ সময় থাকলে অথবা অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে শরীর তার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার কারণে ‘হিট স্ট্রোক’ হয়।
হিট স্ট্রোক হচ্ছে বুঝবেন যেভাবে
বৃদ্ধ ও শিশুদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কম থাকে; তাই তাদের হিট স্ট্রোক বেশি হয়। যারা প্রচন্ড গরমে দীর্ঘ সময় শারীরিক পরিশ্রম করে।
কিছু ওষুধ নিয়মিত সেবন (প্রস্রাব বেশি হওয়ার ওষুধ অথবা মানসিক রোগের ওষুধ)।
● মাথা ঝিমঝিম করা
● অসংলগ্ন আচরণ
● নিশ্বাস দ্রুত হওয়া
● রক্তচাপ কমে যাওয়া
● ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া ও ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়া
● প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
● ত্বক শুষ্ক ও লালচে হয়ে যাওয়া
● রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে
চিকিৎসা
কারও হিট স্ট্রোক হলে দ্রুত যেসব ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে:
■ রোগীকে অপেক্ষাকৃত শীতল কোনো স্থানে নিয়ে যেতে হবে
■ ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিন; ফ্যান ছেড়ে দিন বা বাতাস করুন
■ প্রচুর পানি বা খাবার স্যালাইন পান করতে দিন
■ কাঁধে-বগলে অথবা কুঁচকিতে বরফ দিন
■ দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায় কী?
গরমের দিনে কিছু নিয়ম মেনে চললে হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচা যায়:
● ঢিলেঢালা পোশাক পরুন, হালকা রঙের সুতির কাপড় হলে ভালো
● যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়াযুক্ত স্থানে থাকুন
● রোদে বাইরে যাওয়ার সময় টুপি, ক্যাপ অথবা ছাতা ব্যবহার করুন
● প্রচুর পরিমাণে পানি বা খাবার স্যালাইন অথবা ফলের রস পান করতে হবে
● রোদে দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করবেন না।
● গ্রীষ্মকালে তীব্র শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও হাসপাতালে ভর্তি করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া গেলে বেশির ভাগ হিট স্ট্রোকের রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া এনিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়রিয়া অনেক কারণে হয়, তারমধ্যে রোটা ভাইরাস একটা কারণ। এই ডায়রিয়ার লক্ষণ হচ্ছে, শিশুর অল্প জ্বর থাকে, আবার অনেক সময় জ্বর থাকেও না, পানির মতো পাতলা পায়খানা হয়। কোন ক্ষেত্রে সাদা পায়খানা হয়, কোনটা আবার হলুদ রংয়ের পায়খানা হয়। এই ডায়রিয়াতে রক্ত যায় না, শুরুতে জ্বর থাকলেও তা চলে যায়। এই ধরনের ডায়রিয়া ভালো হতে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ডাঃ শেখ আবু সাঈদ শুভ জানান, শিশুদের ডায়রিয়া বেশি হওয়ার কারণ আবহাওয়ার পরিবর্তন। বড় মানুষ এটা মানিয়ে নিতে পারলেও শিশুরা পারে না। আমরা বলি, আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। শিশু হাসপাতালে তো রোগীদের জায়গা দেওয়ার অবস্থা নেই। অধিকাংশকেই ভর্তি করা লাগছে না। অনেকে হাসপাতালে আনতে দেরি করার কারণে শিশুদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাদের ভর্তি করতে হচ্ছে। ধূলাবালি থেকে শিশুদের দূরে রাখা এবং ঠান্ডা যাতে না লাগে সেদিকে নজর রাখতে হবে।
ডা. আবু সাঈদ শুভ বলেন, ডায়রিয়া হলে মায়েরা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। প্রথম হলো, পাতলা পায়খানা হলে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পরে আপনার বাচ্চার ওজন যত কেজি, তত চামচ স্যালাইন পানি খাওয়ান। ৫ এমএল এর চামচে মেপে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। ডায়রিয়া চলাকালে শিশুকে ধীরে ধীরে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তাহলে শিশু বমি করবে না।
এছাড়া আমরা জিঙ্ক ট্যাবলেট খাওয়াতে বলি। আর এসময় শিশু স্বাভাবিক খাবারই খাবে। মায়ের বুকের দুধ কোনভাবেই বন্ধ করা যাবে না। এভাবে ৫-৭ দিনে শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে অল্প কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সুস্থ হতে। স্যালাইন বানানোর ১২ ঘণ্টা পরে তা আর খাওয়া যাবে না।

















