সাতক্ষীরা

ফেসবুক লাইভ, সব তথ্য সত্য নয়

  আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৫:২১:৫৮ অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পরানদহা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব হালিমা খাতুন দীর্ঘদিন ধরেই বিধবা ভাতা পাওয়ার আশায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রেখেছিলেন। তবে পাশের বাড়ির এক কিশোরের স্মার্টফোনে মাস ছয়েক আগে একজনের ফেসবুক লাইভ থেকে জানতে পারেন, ‘নতুন ভাতা তালিকা বন্ধ, আর আবেদন নেওয়া হবে না।’ সেই কথায় বিশ্বাস করে আর ইউনিয়ন পরিষদে জাননি হালিমা।
পরে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ভাতা পেতে আবেদন প্রক্রিয়া তখনও চলছিল। লাইভে প্রচারিত তথ্যটি ছিল ভুল। এরই মধ্যে সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় আবেদন করার সুযোগ হারান তিনি। হালিমা খাতুনের মতো আরও অনেকে এখন বুঝতে পারছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সব তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। এ জেলায় গ্রামাঞ্চলে এখন খবরের সবচেয়ে দ্রুত মাধ্যম ফেসবুক লাইভ। কিন্তু সেই লাইভ অনেক সময় হয়ে উঠছে বিভ্রান্তি, অপতথ্যের ভান্ডার। পাশাপাশি ছড়াচ্ছে সামাজিক অস্থিরতাও। গ্রামাঞ্চলের মানুষ ফেসবুকে স্থানীয় ভাষায় বক্তব্য এবং দৃশ্যমান ভিডিও দেখে যেকোন তথ্যকেই সত্য হিসেবে বিশ্বাস করছে। এর ফলে এসব তথ্যের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। যাচাইয়ের আগেই তারা শেয়ার করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

মৎস্যজীবি মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নদীতে থাকি, বাজারে গেলে ফোনে যা দেখি তাই আমাদের কাছে খবর। লাইভে যদি ইউনিয়নের নাম ধরে, চেয়ারম্যানের নাম ধরে কথা বলা হয় তখন তো মনে হয় এসবই সত্য।’ তিনি জানান, আমরা দেখি দুর্যোগের সময় সতর্কতামূলক বিপদ সংকেত দেওয়া হয়। গেল বছর একদিন ফেসবুকে দেখলাম ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেওয়া হয়েছে। তাই দেখে অনেক জেলে সেদিন আর মাছ ধরতে যায়নি। পরে জানা যায়, তথ্যটা সঠিক ছিল না।’

ডিজিটাল সচেতনতায় প্রজন্মগত ফারাক স্পষ্ট। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রায়হান হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো তথ্য জানতে পারলে অন্তত অন্য পেজে খুঁজি। কিন্তু আমার বাবা ভিডিও দেখলেই ধরে নেন এই তথ্য সত্য। উনি বলেন, “চোখের সামনে তো দেখতেছি,” ভিডিওর দৃশ্যমানতা বিশ্বাসযোগ্যতার ছাপ তৈরি করছে এটাই বড় সমস্যা।’

এক কিশোরীর মা জানান, তার মেয়ের ছবি ব্যবহার করে একটি লাইভে ভুয়া সহায়তা তোলার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ‘মানুষ ফোন দিছে টাকা পাঠাইতে। আমরা তো কিছুই জানি না। গ্রামের লোকজন আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়।‘ এই অপপ্রচার পরিবারটিকে সামাজিকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

সাতক্ষীরার এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির ব্যবহার জানে, কিন্তু তথ্য যাচাই শেখেনি। মিডিয়া লিটারেসি না থাকায় তারা বুঝতে পারে না কোনটি মতামত, কোনটি তথ্য।’ তার মতে, স্কুল পর্যায়ে এই ধরনের সচেতনতা তৈরিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম শাখা থেকে জানানো হয়, ভুয়া লাইভের কারণে উত্তেজনা, ভুল বোঝাবুঝি ও মানহানির ঘটনা বাড়ছে। অনেকেই না বুঝেই শেয়ার করেন। পরে যখন অভিযোগ আসে, তখন দেখা যায় তথ্যটির কোনো ভিত্তি নেই। সাইবার ক্রাইম শাখা জানায়, সাইবার সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হয়, তবে প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর।

একই কথা জানান সাতক্ষীরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদুর রহমান।
তিনি জানান, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য বা উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচার করলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন, কোনো তথ্য দেখেই তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার না করে আগে সত্যতা যাচাই করতে এবং সন্দেহজনক কিছু হলে থানায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই গুজব প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাতক্ষীরা সাইবার ক্রাইম অ্যালার্ট টিমের পরিচালক শেখ মাহবুবুল হক জানান, স্থানীয় ইস্যু নিয়ে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়। মানুষ পরিচিত স্থান ও ব্যক্তির নাম দেখেই আস্থা পায়। ফলে গ্রামের মানুষ ভাবেন, ‘আমাদের এলাকার কথা, মিথ্যা হবে কেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাতক্ষীরা সাইবার ক্রাইম অ্যালার্ট টিম মিথ্যা, গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে সময় সচেতনমূলক পোস্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে থাকি।

ফেসবুকে নিয়মিত ভিডিও কনটেন্ট তৈরি ও ফেসবুক লাইভ করেন এমন একজনের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ‘মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের ভিত্তিত’ তারা লাইভ করেন। তবে লিখিত নথি বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য নেওয়া হয় কি না এমন প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মেলেনি।
অভিযোগ আছে, তথ্য যাচাই ছাড়াই তাৎক্ষণিক প্রচারই অনেক সময় বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী পুষমিতা রিমি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে অনেক নারীর নিজের ফোন নেই। তারা অন্যের ফোনে যা শোনেন, তাই বিশ্বাস করেন। তাদের জন্যও সচেতনতা প্রয়োজন।‘ তার মতে, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সংগঠনগুলো মাসে একবার হলেও ডিজিটাল সচেতনতা সভা করলে উপকৃত হবে মানুষ।

উপকূলীয় এই জেলায় তথ্য শুধু খবর নয়, জীবিকার সঙ্গেও জড়িত। একটি লাইভের ভুল তথ্য মৎস্যজীবীদের আয় বন্ধ করতে পারে, বিধবার ভাতা আটকে দিতে পারে, কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই সচেতনতার বিকল্প নেই।

দিনমজুর মাসুদ আলী বলেন, ‘লাইভে শুনি সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের রাস্তার নির্মাণ কাজ চলছে। রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ গিয়ে দেখি রাস্তার নির্মাণ কাজ চলছে ঠিকই। তবে চলাচলের জন্য রাস্তার এক সাইড খোলা রাখা হয়েছে।’
কথা হয় এক স্কুল শিক্ষার্থীর সঙ্গে। জানায়, ‘মোবাইলে হাতে থাকলে লাইভ দেখি। অনেক সময় বুঝি না, কী সত্য কী মিথ্যা। বড়রা যখন লাইভে বলে তখন তো সত্য বলেই ধরে নিই, পরে স্কুলে শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, এসব তথ্য সঠিক নয়।’

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী ও সরকারি কৌশলী অসীম কুমার মন্ডল জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব, অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করলে তা দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি বলেন, অনলাইনে মিথ্যা বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধারাভেদে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে; পুনরাবৃত্তি ঘটলে কিছু ক্ষেত্রে সাজা আরও বৃদ্ধি পেয়ে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কারও ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া সহায়তা তোলা, প্রতারণা করা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হলে তা শুধু সাইবার অপরাধ নয়, ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর প্রতারণা, মানহানি, উসকানি বা জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট সংক্রান্ত ধারায় মামলা হতে পারে। অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।
অ্যাডভোকেট অসীম কুমার মন্ডল বলেন, কোনো গুজব বা ভুয়া লাইভ যদি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দাঙ্গা বা সহিংসতার কারণ হয়, তাহলে সেটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে পারেন, কিংবা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করেন। তাই না জেনে, যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তুললেই বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। লাইভের পেজটি পুরোনো কি না, আগের পোস্টগুলোর ধরন যাচাই করা, একই তথ্য বিশ্বস্ত গণমাধ্যমে এসেছে কি না দেখা, সরকারি দপ্তরের অফিসিয়াল পেজ বা নম্বরে যোগাযোগ করে তথ্য নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট শেয়ার না করে রিপোর্ট করা এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই ক্ষতি কমাতে পারে।

সীমান্তবর্তী ও প্রান্তিক জেলা সাতক্ষীরাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া নানা বিভ্রান্তিকর গুজব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকরাও। এ বিষয়ে সাতক্ষীরার সিনিয়র সাংবাদিক আহসানুর রহমান রাজীব বলেন, মাঠের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেখছি, ফেসবুক এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি অনেক সময় গুজবের দ্রুততম বাহন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, যেখানে উপকূলীয় দুর্যোগ, নির্বাচন, সীমান্ত ইস্যু বা ধর্মীয়-সামাজিক সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে একটি ভুয়া পোস্ট মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, গুজব থেকে নিরাপদ থাকতে উৎস যাচাই জরুরি। কোনো সংবাদ দেখার পর তা দেশের মূলধারার টিভি চ্যানেল বা জাতীয় পত্রিকায় আছে কি না নিশ্চিত হোন। অফিসিয়াল পেজ চিনতে শিখুন, জেলা পুলিশ বা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের তথ্যের ওপর আস্থা রাখুন। শেয়ারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো তথ্য সন্দেহজনক মনে হলে তা শেয়ার বা কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার একটি শেয়ার দাঙ্গা বা সহিংসতার কারণ হতে পারে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উসকানিমূলক বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন পোস্ট দেখে উত্তেজিত না হয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান। অনলাইনে পাওয়া তথ্যের ফ্যাক্ট চেক করতে হবে। সংবাদের সত্যতা নিশ্চিতে ‘রিউমার স্ক্যানার’ বা ‘ফ্যাক্ট ওয়াচ’-এর মতো সাইটগুলো চেক করতে পারেন।

আরও খবর