আলী মুক্তাদা হৃদয় ৯ জুলাই ২০২৫ , ৫:২৫:৪৩ অনলাইন সংস্করণ
টিউবওয়েল-টয়লেটও পানির নিচে , পঁচা পানিতে ছড়াচ্ছে রোগ
মৎস্য ঘের-দখল খালেই কাল, শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না
সাতক্ষীরার ঘরবাড়ি নয়, যেন মাছের ঘের! কয়েকদিনের টানা বর্ষণ, দখল-দূষণে মৃতপ্রায় খাল আর ভেঙে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা এখন পৌরবাসীর নিত্যদিনের গ্লানি। শহরের অন্তত ১৫টির বেশি এলাকাজুড়ে হাঁটু থেকে কোমর পানি। কোথাও ঘরের ভেতরে পানি, কোথাও আবার রাস্তার ওপর দিয়ে বইছে ড্রেনের পঁচা তরল।
২৪ ঘণ্টায় ১০২ মি.মি. বৃষ্টি!
আবহাওয়া অফিস জানায়, গত এক সপ্তাহে সাতক্ষীরায় ২৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় ১০২ মি.মি.। এই অতিবৃষ্টির সরাসরি প্রভাবে প্লাবিত হয়েছে কামালনগর, পলাশপোল, মধুমোল্লারডাঙি, রাজারবাগান, রসুলপুর, গদাইবিল, রথখোলা, বদ্দিপুর কলোনি, পার-মাছখোলা ও ইটাগাছাসহ পৌরসভার ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকা।

নষ্ট টয়লেট-টিউবওয়েল, ছড়াচ্ছে রোগ
নোংরা পানি টয়লেট ও পানির উৎস টিউবওয়েলকেও ছাড় দেয়নি। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। পঁচা পানির মধ্যে ডুবে থাকা ঘরবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। শিশু ও বৃদ্ধরা পড়েছে বেশি বিপাকে।
“বাড়ির ভেতরে পানি, শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না”
বদ্দিপুর কলোনির মনজুরুল কবির বলেন, “চার-পাঁচ মাস এভাবেই হাঁটু পানি জমে থাকে। গোসল, খাওয়ার পানি সংগ্রহ করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। শিশুরা ঠিকমতো স্কুলেও যেতে পারছে না, পঁচা পানির দুর্গন্ধ আর সাপের ভয়ে।”
ড্রেনের বদলে উঠানে পানি!
রসুলপুর, পলাশপোল ও ইটাগাছা এলাকার চিত্র ভয়াবহ। পুলিশলাইন সড়কসহ প্রধান সড়কগুলোতে ড্রেনের নোংরা পানি রীতিমতো রাস্তায় প্রবাহিত। অলিগলি যেন ময়লার খাল।
বারুইপাড়ার দীনু রঞ্জন বলেন, “কুখরালী উত্তরপাড়ার রাস্তাটি এক মাস ধরে পানির নিচে। প্রায় ৫০০ জন মানুষ পুরোপুরি পানিবন্দি। পানি বের হওয়ার যে বিল ছিল, প্রভাবশালীরা সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে।”

খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, কোটি কোটি টাকায় খননকৃত নদী ও খালগুলো এখন পানিনিষ্কাশনের বদলে জমাটবদ্ধ জলাধার। খালের তলদেশ না কেটে কৃত্রিমভাবে উঁচু করে গভীরতা দেখানো হয়েছে। কমানো হয়েছে প্রশস্ততাও। ফলে বর্ষার পানি আটকে যাচ্ছে শহরে, আবার কখনও নদীর পানি ঢুকেও পড়ছে লোকালয়ে।
“অপরিকল্পিত ঘেরই এখন শহরের ঘেরাটোপ!”
বাসিন্দারা বলছেন, জলাবদ্ধতার পেছনে মৎস্য ঘের মালিকদের দখল ও অনিয়ন্ত্রিত বাঁধাই দায়ী। শহরের আশপাশে অসংখ্য ঘের পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কামালনগর, দক্ষিণ কুখরালী, বারুইপাড়া এলাকায় বিল ও খালের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
“সরকার আসে, দুর্ভোগ যায় না”
দক্ষিণ কামালনগরের মততাজ আক্ষেপ করে বলেন, “সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু আমাদের কষ্ট কমে না। যদি ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক থাকত, এই দুর্ভোগ হতো না। কাগজে কলমে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা, বাস্তবে চিত্র উল্টো।”
ইউএনও’র পরিদর্শন, আশ্বাসে আশার আলো
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোয়াইব আহমাদ জানান, “পানি নিষ্কাশনে ঘের মালিকদের সাথে একাধিকবার বৈঠক করেছি। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”

















