সাতক্ষীরা

অনলাইন চিকিৎসায় স্বাস্থ্যঝুঁকি, সচেতন হোন এখনই

  আলী মুক্তাদা হৃদয় ১ মার্চ ২০২৬ , ১১:১৮:৪৩ অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং চিকিৎসাসেবার দূরত্বের কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ভুয়া বা যাচাইবিহীন চিকিৎসা পরামর্শের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউবে ছড়িয়ে থাকা নানা স্বাস্থ্যতথ্য সহজলভ্য হলেও তার বড় অংশই প্রমাণিত নয়। ভুল চিকিৎসা ও জটিলতা বাড়িয়ে মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এসব তথ্য।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ আবু সাঈদ শুভ বলেন, ‘অনলাইনে নিজেকে বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে অনেকে লাইভে এসে বা ভিডিও বানিয়ে ওষুধের পরামর্শ দিচ্ছেন। মানুষ চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে সেই পরামর্শ অনুসরণ করছেন। এতে রোগ আরও জটিল হয়ে হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা দেরিতে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ায় নিউমোনিয়া বা ডিহাইড্রেশনের মতো জটিলতায় ভুগছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিবন্ধিত চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং কখনো কখনো প্রাণঘাতীও হতে পারে।’

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী রফিক (২২) জানান, অর্থ সংকট ও দ্রæত সমাধানের আশায় তিনি অনেক সময় অনলাইনে চিকিৎসা তথ্য খোঁজেন। ‘আমরা যেসব ভিডিও বা পরামর্শ অনলাইনে দেখি তার কোনটা আসল কোনটা ভুয়া বুঝতে পারি না। আর গ্রামের মানুষ তো আরও বিভ্রান্ত হয়।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই ইউটিউব অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড দিয়ে ভিউ বাণিজ্যের আশায় গ্রামের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে।’

কথা হয় কলারোয়া উপজেলার গৃহবধূ রুমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বামীর আয় সীমিত এবং সবচেয়ে কাছের সরকারি হাসপাতালও বাড়ি থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় সন্তানের অসুস্থতায় তিনি প্রথমে অনলাইনেই সমাধান খুঁজেছিলেন। ‘আমার বাচ্চার হালকা শুকনো কাশি হয়েছিল। ইউটিউবে দেখে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াই। কিন্তু একদিন পর কাশি বেড়ে যায়। পরে একজন নিবন্ধিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি বলেন, ভুল ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। পরে তার চিকিৎসায় ভালো হয়।’

আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা আহসান হাবিব (২৫) বলেন, ‘আমাদের গ্রামে হাসপাতাল অনেক দূরে। অনলাইনে শুনে ওষুধ খাই। অনেক সময় রোগ আরও বেড়ে যায়।’
অনলাইনের সব তথ্যই যে সঠিক নয় এই সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাহী আক্তার। তিনি জানান, তার এক আত্মীয় অনলাইনে শুনে ডায়রিয়ার ওষুধ খেয়ে জটিলতায় পড়ার পর তিনি সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগী হন। তিনি বলেন, ‘আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বা নিবন্ধিত চিকিৎসকদের লেখা শেয়ার করি। কিন্তু এখনও দেখি, কেউ অসুস্থ হলে কমেন্টে নানা ধরনের অযাচিত পরামর্শ চলে আসে।’

স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করতে গিয়েও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সদর উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী নাসিমা পারভীন। তিনি বলেন, অনেকে না বুঝে ফেসবুক, ইউটিউব থেকে চিকিৎসা পরামর্শ নেন। এতে রোগ আরও ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি এক কিশোরী ত্বকের সমস্যায় ভুগে অনলাইনে কারও কাছ থেকে শোনা ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করায় তার ত্বক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুল ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে। আমরা তাকে চিকিৎসকের কাছে পাঠাই।

তিনি বলেন, ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা এসব ভুল পরামর্শে অনেকেই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধও খাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।’ তিনি জানান, স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমে তারা মানুষকে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ জামিল বলেন, ‘ভাইরাল তথ্য বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা পরামর্শের ওপর নির্ভর করলে রোগ দীর্ঘমেয়াদে জটিল হতে পারে। ভুল অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণ তৈরি হচ্ছে, যা বড় ঝুঁকি।’

চিকিৎসক সংকটের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সদর উপজেলায় সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসকের পদসংখ্যা অনুমোদিত থাকলেও বাস্তবে সব পদে চিকিৎসক কর্মরত নেই। ফলে রোগীর চাপ বেশি। এই সুযোগে অনলাইনভিত্তিক ভুয়া চিকিৎসা বাড়ছে।’

উপকূলীয় সাতক্ষীরায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর তিনি কয়েকটি সুপারিশ করেন। প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক থাকা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবির আয়োজন করা এবং অনলাইনের ভুল তথ্য চিহ্নিত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা চালানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া জরুরি বলে মত তার।

সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোঃ আব্দুস সালাম বলেন, ‘নিবন্ধিত চিকিৎসকের বাইরে কেউ চিকিৎসা পরামর্শ দিলে তা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষকে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যবস্থা নেবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যতথ্য ছড়ালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে এবং এ বিষয়ে প্রশাসন নজরদারি বাড়াচ্ছে বলে জানান সদর উপজেলার ইউএনও অর্ণব দত্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক ও ভুল তথ্য পার্থক্য করতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে তথ্যদাতা ব্যক্তি নিবন্ধিত চিকিৎসক কি না, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মস্থল উল্লেখ আছে কি না এবং সরকারি বা স্বীকৃত স্বাস্থ্য সংস্থার সূত্র দেওয়া হয়েছে কি না। কোনো ওষুধের নাম উল্লেখ থাকলে তা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সেবন না করাই নিরাপদ।

আরও খবর