সাতক্ষীরা

ভোমরা বন্দরে জ্বালানি সংকটে মিলছে না ট্রাক, জমছে পণ্যের স্তূপ

  আহসানুর রহমান রাজীব ১৩ এপ্রিল ২০২৬ , ৩:৪৬:১৭ অনলাইন সংস্করণ

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি খাতে। ডিজেল সংকটের কারণে এ বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমে গেছে। একই সঙ্গে সংকটকে পুঁজি করে ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২-৩ হাজার টাকা।
জ্বালানি তেলের এ অস্থিরতায় আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। সেইসঙ্গে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বন্দরে আগের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ কমেছে, যা সামগ্রিক রাজস্ব আদায়েও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পণ্য পরিবহনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চালকরা। পেশায় একজন ট্রাকচালক কবির হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আমরা চরম ভোগান্তির মধ্যে আছি। ভোমরা বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পথে গত কয়েক দিনে আমাকে অন্তত ৫-৬টি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। কোনো পাম্পে তেল নেই, আবার কোথাও থাকলেও চাহিদামত দিচ্ছে না। ২০-৩০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হচ্ছে। আবার পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রাক চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে।’
‘২০-৩০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হচ্ছে। আবার পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রাক চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে’
আরেক ট্রাকচালক মো. শরিফ বলেন, ‘তেল সংকটের কারণে আমাদের এখন দূরের ট্রিপ দিতে ভয় লাগছে। আগে একবার ট্যাংক ফুল করলে নিশ্চিন্তে গন্তব্যে চলে যেতাম। এখন অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর তেল ফুরিয়ে গেলে পাম্পে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।’
তিনি আরও বলেন, ‘মালিকরা ভাড়া বাড়াতে বলছেন। কারণ তাদের খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তো বাড়তি ভাড়া সহজে দিতে চায় না। আবার পাম্প মালিকরা বলছেন, তেলের সরবরাহ কম। সবমিলিয়ে আমরা চালকরা মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছি। জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ট্রাকের চাকা বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
পরিবহন সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে ব্যবসায়ীদের বক্তব্যেও। ভোমরা স্থলবন্দরের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী মো. মনি বলেন, ‘বন্দরে এখন আর আগের মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ব্যবাসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রাক সরবরাহ করতে পারছি না। প্রতিদিন শত শত টন পণ্য খালাস হলেও ট্রাকের অভাবে তা বন্দরেই পড়ে থাকছে। ট্রিপ দিতে গেলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় ব্যবসায়ীদের কথা দিয়েও আমরা ট্রাক পাঠাতে পারছি না। এতে ব্যবসায়িক বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। ট্রিপ সংখ্যা কমে যাওয়ায় আমাদের আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে আসছে।’
‘বন্দরে এখন আর আগের মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ব্যবাসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রাক সরবরাহ করতে পারছি না। প্রতিদিন শত শত টন পণ্য খালাস হলেও ট্রাকের অভাবে তা বন্দরেই পড়ে থাকছে। ট্রিপ দিতে গেলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় ব্যবসায়ীদের কথা দিয়েও আমরা ট্রাক পাঠাতে পারছি না’
তবে ভাড়ার এ ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী শেখ রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘তেল সংকটের কারণে ভাড়া বাড়ার কথা থাকলেও বর্তমানে যে হারে বেড়েছে তা অস্বাভাবিক। মূলত কিছু অসাধু চক্র বা সিন্ডিকেট এ সুযোগে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। ফুয়েল স্টেশনগুলোতে সিরিয়াল থাকলেও ট্রাকগুলো কিন্তু তেল পাচ্ছে। অথচ এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু ট্রাক মালিক অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আমরা যারা সৎভাবে ব্যবসা করতে চাই, তাদের ক্ষতি হচ্ছে।’
বন্দরে ট্রাকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানান ভোমরা স্থলবন্দরের ট্রান্সপোর্ট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. লুৎফর রহমান মন্টু।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে দূরপাল্লার পণ্য পরিবহনে আমরা সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছি। সব পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। কোথাও পাওয়া গেলেও দীর্ঘ লাইনে ট্রাকগুলোকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে ফিরতি ট্রাকগুলো সময়মতো বন্দরে আসতে পারছে না। এই চেইনটা ভেঙে পড়ায় পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
লুৎফর রহমান বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কাঁচামাল বা পচনশীল পণ্য। সময়মতো না পৌঁছালে কাঁচামরিচ, আদা বা ফলের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে ভোমরা স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী জানান, এ বন্দর দিয়ে ফল, পেঁয়াজ, আদা, কাঁচামরিচ ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকলেও বাকি সব পণ্য আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে রাইস ব্র্যান অয়েল, ঝুট কাপড় ও শিশুখাদ্যসহ বেশ কিছু পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়।
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে পণ্য আনা পর্যন্ত খরচ স্বাভাবিক থাকলেও দেশীয় পরিবহনে আমাদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ট্রাক ভাড়ার এ অস্থিরতা ও সময়মতো ট্রাক না পাওয়ার কারণে আমরা বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছি। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পণ্য বাজারে না পৌঁছানোর কারণে আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। ফলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোমরা স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা বলেন, ভোমরা এখন পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউজে রূপান্তর হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অনেক সুবিধা পাচ্ছেন। ঠিক এসময়ে জ্বালানি সংকট আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০ ট্রাক পণ্য আমদানি হতো, এখন তা কমে ২০০-তে নেমে এসেছে।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখতে সরকারকে বিশেষ নজর দেওয়ার দাবি জানান তিনি। আবু মুসার মতো, জরুরি এ সেক্টরের পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। তা নাহলে আগামীতে বন্দর থেকে পণ্য সরবরাহ আরও কমে যাবে। নিত্যপণ্যের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আরও খবর