তালা প্রতিনিধি ১৫ জুলাই ২০২৫ , ২:৩৩:৩৮ অনলাইন সংস্করণ
তালা উপজেলায় টানা অতিবৃষ্টির ফলে খাল-বিলের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। শত শত বিঘা পাটের ক্ষেত, বীজতলা এবং অন্যান্য ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে, ফলে কৃষকরা চাষাবাদের সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কিত। এছাড়া, শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় এলাকায় মানবেতর জীবনযাপনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, তেতুলিয়া ইউনিয়নের শিরাশুনি, লাউতাড়া, সুভাশিনী, মদনপুর, শুকদেবপুর, নওয়াপাড়া এবং কেশবপুর উপজেলার হিজলডাঙ্গা, বাউশলা, পশ্চাক্রা, শ্রীফলা, আঠন্ডা, ও লক্ষীনাথকাটি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে খাল-বিল ও বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। গত বছরও এই এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ঘরবাড়ি, উঠান, রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। ফসল ঘরে তুলতে না পারা এবং বীজতলা নষ্ট হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক ধান চাষ করতে পারেননি। প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি জীবনযাপন এবং হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের কর্মহীনতার কারণে এলাকাবাসী মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।
শিরাশুনি এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান, জিয়াউর রহমান, নওশের আলী, আক্তারুজ্জামান ও কুদ্দুস শেখ বলেন, “গত বছরের জলাবদ্ধতার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এ বছরও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না।” তারা আরও জানান, জলাবদ্ধতার সময় অনেকে সমাধানের আশ্বাস দিলেও পানি নেমে গেলে কেউ আর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয় না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম শুধু পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান, মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী ও আমিনুর রহমান জানান, অপরিকল্পিত মাছের ঘের এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। ছোট ছোট মাছের ঘেরে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা এবং রাস্তার উপর নির্মিত কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জানান, ঘের মালিকরা কালভার্টের মুখে বালুর বস্তা ও লোহার গ্রিল ব্যবহার করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে, ফলে বৃষ্টির পানি খাল বা নদীতে নামতে পারছে না। শিরাশুনি, লাউতাড়া, সুভাশিনী, হিজলডাঙ্গা ও নরনিয়া অঞ্চলের কালভার্টের মুখ পরিষ্কার করা গেলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক মীর জিল্লুর রহমান জানান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণের সহযোগিতায় উপজেলা পানি কমিটি ও প্রশাসন তেতুলিয়া ইউনিয়নের জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে। খাল পরিষ্কার, কালভার্টের মুখ পরিষ্কার এবং কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া, জলাবদ্ধতা নিরসনে সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে, তিনি অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু পরিদর্শন ও পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
তেতুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, “তালা, যশোরের মনিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পানি ভদ্রা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে, ভদ্রা নদীর তলদেশে পলি জমে উঁচু হয়ে যাওয়ায় এবং নরনিয়া খালে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ভদ্রা নদী ও নরনিয়া খাল খনন জরুরি। নরনিয়া স্লুইস গেট থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদী খনন না হলে এ বছর গত বছরের তুলনায় আরও বেশি জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।”
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপা রাণী সরকার জানান, তিনি যোগদানের পর থেকেই জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আজ সকাল ৭টা থেকে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে তেতুলিয়া ইউনিয়নের নওয়াপাড়া থেকে দেওয়ানিপাড়া পর্যন্ত খালের নেটপাটা অপসারণ করা হয়েছে। সরকারি খাল ও কালভার্টের মুখ পরিষ্কার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামীতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, আপার ভদ্রা নদীর নরনিয়া থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত খননের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পলি অপসারণের কাজ শুরু হবে, যা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

















