সাতক্ষীরা

সংকটে মফস্বল সাংবাদিকতা

  নাজমুল হক ৩০ অক্টোবর ২০২৫ , ২:২৪:৩৭ অনলাইন সংস্করণ

তথ্যই শক্তি। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হলো সাংবাদিক। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা গুজবের গজব রুখছে। সাংবাদিকদের সমাজ দর্পনের কারিগর বলা হয়। একটি সুন্দর, দুর্নীতিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিহার্য। আজ প্রযুক্তির উন্নয়নে সংবাদের বিভিন্ন মাধ্যম তৈরি হলেও, ছাপা সংবাদপত্রের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি; বরং এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্বলিত অন লাইন মিডিয়া। আবার দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও তাদের সংবাদ পরিবেশন করছে ইউটিউবে। শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি বিষয়গুলো মিডিয়ার প্রধান উৎস। যারা সংবাদপত্রের পাতাকে প্রতিদিনই নিত্য নতুন খবর দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরছে তাদের একটি বড় অংশ মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। বর্তমানে নানাবিধ সংকটে আছে সংবাদকর্মীরা; বিশেষ করে মফস্বল পর্যায়ের (জেলা ও উপজেলা) সাংবাদিকরা।
মফস্বল সাংবাদিকরা ভয়কে উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সংবাদ সংগ্রহ করছে। রাত নেই, দিন নেই, যখন যেখানে যা ঘটছে, দ্রæত সেখানে চলে যাচ্ছেন সেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য। অথচ এই মফস্বল সাংবাদিকদের তেমন বেতন বা সম্মানী নেই। হাতে গোনা দু-একটা পত্রিকার প্রতিনিধিরা নামমাত্র সম্মানী পান, যা থেকে নিজের পকেট খরচ চালানোও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাহলে প্রশ্ন আসে, তারা কেন এই পেশায়? সাংবাদিকতা মূলত নিজের খেয়ে বনের মেষ তাড়ানোর মতো। দেশ, দেশের মানুষকে ভালোবেসে, দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করে কিছু সৃজনশীল মানুষ এই পেশায় আসেন। এখানকার আয় দিয়ে সংসার চালানোর কথা ভেবে নয়, বরং সমাজের জন্য ভালো কিছু করার দৃঢ় প্রত্যয় তাদের। নিজের অন্য কোনো কর্মের আয় বা সংসারের টাকা খরচ করে ক্যামেরা, কম্পিউটার বা চলাচলের জন্য বাইক কিনতে হয় তাদের। সংবাদ সংগ্রহ ও পত্রিকা অফিসে সংবাদ পাঠানোর জন্য ইন্টারনেট, যাতায়াত খরচটাও নিজ পকেট থেকে করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। অনেকে অন্য কোন ব্যবসা বা পেশার সাথে বেছে নেন সাংবাদিকতা নামক সৃজনশীল কাজ।
বেশির ভাগ সাংবাদিকের মাসের কর্মব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরতে হয় খালি হাতে। গিন্নি বা সন্তানদের সামনে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকতে হয়। কখনো কখনো সন্তানদের কাছে মিথ্যা কথা বলতে হয় ওদের ছোটখাটো আবদার মেটাতে না পারার জন্য। এটা যে কতটা লজ্জার, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। এরপরও অনেকে সাংবাদিকদের বলে থাকেন চাঁদাবাজ। কেউ কেউ তো সাংবাদিক না বলে, বলে সাংঘাতিক। সাংবাদিকদের মধ্যে দু-একজন যে অপসাংবাদিকতা করে না, এ কথা বলা যাবে না। এরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে, নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। তবে সে সংখ্যা হাতে গোনা।
সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জের নাম। সাংবাদিকদের প্রতিটা দিন, প্রতিটা সময় এক একটি চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা পরিস্থিতি। মফস্বলের টেলিভিশন সাংবাদিকতা আরো কঠিন হচ্ছে পিইপি সংকটের কারণে। বিভিন্ন সময় দুর্গোগেও তাদের পেহাতে নানা দুর্ভোগ। সারা দেশের সাথে কার্যত যোগাযোগ বন্ধ হওয়ায় নতুন করে শুরু হয়েছে আরো কিছু সংকট। বন্ধ হয়েছে কিছু পত্রিকার ছাপার কাজ। পত্রিকাগুলো টিকে থাকে বিজ্ঞাপনের উপর। বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করে সংবাদকর্মীদের আর্থিক স্বচ্ছলতা। কিন্তু সেটাও বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে আর্থিক সংকটে ভুগছে অধিকাংশ মিডিয়া হাউজগুলো ও তার সংবাদ কর্মীরা। তবে উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে যারা শুধুমাত্র সাংবাদিকতা পেশার সাথে আছেন তাদের অবস্থা আরো নাজুক। তারা না পারছে বলতে-না পারছে সইতে।
পেশাগত কারণেই সাংবাদিকরা সমাজের অনেকের সাথে অপ্রিয় পাত্র হয়েছে। তারা সমাজের নানান অসংগতি তুলে ধরছে, তুলে ধরছে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের নানান কর্মকান্ডসহ উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা। অনেক জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছে সাংবাদিকরাই। তাদের পেশা সম্মানজনক হলেও আর্থিক ভিত্তি তলানীতে গেছে। বর্তমানে তাই কিছু সাংবাদিকের এই চরম দুঃসময়ে তারা কারো কাছে না পারছে সইতে- না পারছে বলতে। এ ক্ষেত্রে পত্রিকার মালিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিত্তশালীরা ভুমিকা রাখতে পারেন। তাদের সাথে যারা সারা দিন পরিশ্রম করে তাদেরকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছে এখন সময় এসেছে সেই সংবাদকর্মীদের পাশে দাঁড়াবার। সরকারের জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে মিডিয়াভুক্ত পত্রিকা আছে। সর্বশেষ পত্রিকার সাংবাদিকদের তথ্য জেলা পর্যায়ের তথ্য অফিসে রয়েছে। রয়েছে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংবাদিকদের একাধিক সংগঠন। তাদের সাথে আলোচনা করে তাদের আর্থিক দুরবস্থা মেটানোর উদ্যোগ নিতে হবে, মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক মিডিয়াভুক্ত পত্রিকা সম্প্রতি অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। তারা বাঁচলে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাঁচবে। এ শিল্প বাঁচালে সুশাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি সুন্দর অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। সংবাদপত্র শিল্প ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বাঁচাতে হলে স্থানীয় বিত্তশালী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনসহ সরকারের প্রণোদনার বিকল্প নেই।

লেখক: নাজমুল হক, সভাপতি, স্বপ্নসিঁড়ি

আরও খবর