শ্যামনগর

সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ বন্ধে দেড় মাস: কষ্টে দিন কাটাচ্ছে জেলে পরিবার

  এম কামরুজ্জামান, শ্যামনগর ব্যুরো ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৫:১৫:১৭ অনলাইন সংস্করণ

পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় কাঁকড়া আহরণে দুই মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞার দেড় মাস অতিবাহিত হয়েছে। প্রজনন মৌসুমে বনজ সম্পদ রক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও জীবিকার প্রধান উৎস বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপকূলের হাজারো জেলে পরিবার। সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে অনেকেই এখন ধারদেনা, এনজিও ঋণ কিংবা আত্মীয়স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিকভাবে কাঁকড়ার উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ জেলেদেরই উপকারে আসবে। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় তাৎক্ষণিক সংকটে পড়েছেন উপকূলের মানুষ।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা, কয়রা উপজেলা ও আশাশুনি উপজেলা-এর উপকূলবর্তী এলাকায় হাজার হাজার পরিবার সরাসরি কাঁকড়া আহরণের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের অধিকাংশ সময় নদী ও খালে কাঁকড়া ধরে তারা সংসার চালান। নিষেধাজ্ঞার কারণে নদীতে নামতে না পেরে আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শ্যামনগরের এক জেলে জানান, “দেড় মাস হয়ে গেল নদীতে যেতে পারছি না। ঘরে চাল নেই, বাজারে বাকিও আর দেয় না। বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।” আরেক জেলের ভাষ্য, “সরকারি সহায়তার কথা শুনেছি, কিন্তু এখনো কিছু পাইনি। নিষেধাজ্ঞার সময় অন্তত চাল-ডাল দিলে পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, অনেক পরিবার ইতোমধ্যে সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে। কেউ কেউ গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, কেউ ধারদেনা বাড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নদীতে যেতে না পারায় নারী ও শিশুরাও মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখলে কাঁকড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যা ভবিষ্যতে অধিক উৎপাদন ও আয়ের সুযোগ তৈরি করবে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের জন্যই কল্যাণকর। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
তবে উপকূলবাসীর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভিজিএফ, খাদ্য সহায়তা কিংবা বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করা হলে জেলেদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হতো। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ যেমন সাময়িক কৃষিকাজ, সড়ক সংস্কার বা সরকারি প্রকল্পে অস্থায়ী নিয়োগ নিলে অর্থনৈতিক চাপ কমতে পারত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে আহরণ বন্ধ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা বলয় জোরদার না হলে এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে বন সংরক্ষণ ও জীবিকা দুই দিকেই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
নিষেধাজ্ঞার বাকি সময়টুকু কীভাবে পার করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন গুনছেন উপকূলের হাজারো জেলে পরিবার। তাদের একটাই প্রত্যাশা দ্রুত কার্যকর সরকারি সহায়তা এবং টেকসই সমাধান, যাতে বনও বাঁচে, মানুষও বাঁচে।

আরও খবর