মো. রাজু সিদ্দিকী ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ , ৩:৪৭:৫৩ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে গ্রামে কুমড়ো বড়ি তৈরির যেন উৎসব চলছে। বাড়ির আঙিনা ও আশপাশে মাচা করে সেখানে শুকানো হচ্ছে বড়ি। প্রতিবছরের মতো এবারও শীত মৌসুমের শুরুতে বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত এখানকার নারীরা। মাষকলাই ভিজিয়ে সেই ডালের সঙ্গে পাকা চালকুমড়ো মিশিয়ে তৈরি করা হয় এ সুস্বাদু বড়ি। শীতের সময় গ্রামের প্রায় ৮০ ভাগ নারী পালা করে বড়ি তৈরি করার কাজটি করে থাকেন।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এক খাবার হলো কুমড়া বড়ি। এটি তরকারির স্বাদে যোগ করে নতুন মাত্রা। বাজারে বিভিন্ন ধরনের বড়ি পাওয়া গেলেও চালকুমড়ার সঙ্গে মাষকলাই ডাল মিশিয়ে তৈরি বড়ি সবার কাছে খুবই প্রিয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের পৌরসভার কুখরালী, ধুলিহর ফিংড়ী, ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে গ্রামে কুমড়া বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত নারী।
প্রতি কেজি বড়ি তৈরিতে প্রয়োজন হয় এক কেজি মাষকলাই ও একটি মাঝারি আকারের চালকুমড়ো। বড়ি তৈরির জন্য বাজার থেকে প্রতি কেজি মাষকলাই কিনতে হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।
ধুলিহর এলাকার বাসিন্দা নাজমা খাতুন বলেন, গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যের মধ্যে কুমড়ার বড়ি অন্যতম। এটি প্রতিটি তরকারিতে বাড়তি স্বাদ এনে দেয়। এই বড়ি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য মাছ-গোশত সমান। তাই শীত এলেই গ্রামাঞ্চলের লোকজন বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাড়ার অনেক পরিবার এক হয়ে বড়ি বানাই। বড়ি ভেঙে খোলায় হালকা ভেজে পেঁয়াজ, রসুন ও শুকনা মরিচ দিয়ে ভর্তা করলে এক চমৎকার খাবার তৈরি হয়। এ ছাড়া বড়ি তেলে ভেজে বেগুন, ফুলকপি, আলুর তরকারিতে দিলে স্বাদ অনেক বেড়ে যায়।
বড়ি তৈরির পদ্ধতি জানতে চাইলে রেখা খাতুন বলেন, বড়ি তৈরিতে মূলত চালকুমড়ো এবং মাষকলাইয়ের ডাল প্রয়োজন হয়। বড়ি তৈরির আগের দিন ডাল ভিজিয়ে রাখতে হয়। কুমড়ো ছিলে ভেতরের নরম অংশ ফেলে মিহিভাবে কুচি করে রাখতে হয়। এরপর কুমড়ো খুব ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে বেঁধে সারা রাত ঝুলিয়ে রাখতে হয়। অন্যদিকে ডালের পানি ছেঁকে শিলপাটায় বেটে নিতে হয়।
এরপর বাটা ডালের সঙ্গে কুমড়ো মেশাতে হয়। যতক্ষণ না ডাল-কুমড়োর মিশ্রণ হালকা হয়, ততক্ষণ খুব ভালো করে হাত দিয়ে এ মিশ্রণ মিশাতে হয়। এরপর কড়া রোদে চাটি বা কাপড় বিছিয়ে বড়ির ছোট ছোট আকার দিয়ে একটু ফাঁকা ফাঁকা করে বসিয়ে শুকাতে হয়।এভাবে বড়ি তিন থেকে চার দিন ভালো করে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে অনেক দিন পর্যন্ত খাওয়া যায়।
জেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শীতের শুরুতেই এ সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় নারীরা মজাদার কুমড়া বড়ি তৈরি করেন। একসময় পরিবারের প্রয়োজনে কুমড়া বড়ি তৈরি করা হলেও এখন বিষয়টা বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। উপজেলায় অনেক পরিবার সারা বছর এই বড়ি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে। সেই সঙ্গে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে বড়ি তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বাড়ির আঙিনায়, মাঠে মাচা তৈরি করে কিংবা টিনের ঘরের চালে কৃষকরা চালকুমড়ার চাষ করে থাকেন। উৎপাদিত এসব চালকুমড়া থেকে কিষানিরা বড়ি তৈরি করেন। গ্রামীণ এসব নারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।

















