আলী মুক্তাদা হৃদয় ১৪ জুলাই ২০২৫ , ৮:২৪:৪৩ অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল শ্যামনগর, আশাশুনি। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের কবলে বিধ্বস্ত এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এখন যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম। নোনা পানির আগ্রাসনে ফসলের জমি নষ্ট, মাছের ভেড়ি ধ্বংস, আর জীবিকার পথ সংকুচিত। এই দুর্যোগের মধ্যেই আরেকটি নীরব ট্র্যাজেডি ঘটছে। কন্যাসন্তানদের বোঝা মনে করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক সংকট এখন বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতনের এক নতুন মাত্রা যোগ করছে।
তবে, বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যের এই নীরব ট্র্যাজেডি থামাতে হলে সরকার, এনজিও এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারলে সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
জলবায়ু দুর্যোগ ও বাল্যবিয়ের সম্পর্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সমস্যা তীব্র হয়েছে। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর থেকে সাতক্ষীরার চারটি উপজেলায় বেড়িবাঁধের এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে গেছে, ফলে জোয়ারের লোনা পানি অবাধে প্রবেশ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। ফসলের জমি নষ্ট হওয়ায় কৃষক পরিবারগুলোর আয় কমেছে, আর এই অর্থনৈতিক সংকটই কন্যাসন্তানদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোছাঃ আসমা-উল-হুসনা বলেন, “জলবায়ু দুর্যোগের কারণে দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কন্যাসন্তানকে ‘বোঝা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “লবণাক্ত পানির কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে। এই অবস্থায় বাল্যবিয়ে বাড়ছে, আর এর সঙ্গে নারী নির্যাতন ও তালাকের ঘটনাও বাড়ছে।”

শ্যামনগর উপজেলার ১৬ বছর বয়সী তাহমিনা খাতুনের জীবন এখন যেন এক অন্ধকার গল্প। দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে তাদের পরিবারের একমাত্র সম্পদ একটি মাছের ভেড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। বাবা আব্দুল গফুর, যিনি দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, আয়ের উৎস হারিয়ে পড়েন চরম দারিদ্র্যে। তাহমিনার মা আমেনা বেগম বলেন, “আমাদের আর কিছু ছিল না। তাহমিনার বিয়ে না দিলে তাকে খাওয়ানোর মতো অবস্থা ছিল না। তাই ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে দিয়েছি।” কিন্তু বিয়ের পর তাহমিনা তার স্বামীর বাড়িতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এখন সে তার বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছে, কিন্তু সমাজে তাকে ‘বোঝা’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
একই উপজেলার আরেক কিশোরী সুমাইয়া (১৫)। তার বাবা মোকাররম হোসেন জানান, “লোনা পানিতে আমার জমি নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ ধরে যা আয় হতো, তাও বন্ধ। তিন মেয়ের মধ্যে সুমাইয়াকে ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছি। এটা আমাদের বাধ্যতা ছিল।” সুমাইয়ার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছেন, এবং এখন সে তার মায়ের সঙ্গে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
সামাজিক বৈষম্য ও নারী নির্যাতন
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক সংকটই তৈরি করছে না, এটি সামাজিক বৈষম্য ও নারী নির্যাতনের মাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জেলা মহিলা পরিষদের সূত্রে জানাযায়, “দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে, যেমন সাতক্ষীরার, নারীদের প্রতি সহিংসতার হার বেশি। আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য পৃথক টয়লেট বা নিরাপদ স্থানের অভাবে যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। লবণাক্ত পানির কারণে কৃষি ও জীবিকা ধ্বংস হওয়ায় পরিবারগুলোতে তালাক ও বহুবিবাহের প্রবণতা বাড়ছে। এর শিকার হচ্ছে নারীরা।”
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার একটি আশ্রয়কেন্দ্রের সাক্ষাৎকারের সময় ১৮ বছর বয়সী ফাতেমা খাতুন জানান, “ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। কিন্তু সেখানে পুরুষদের সঙ্গে একই জায়গায় থাকতে হয়। মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট ছিল না। আমি ভয়ে রাতে টয়লেটে যেতাম না।” ফাতেমার মতো অনেক নারীই আশ্রয়কেন্দ্রে যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছে। আমরা বাল্যবিয়ে রোধে সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবার এই বিষয়ে উদাসীন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা স্থানীয় এনজিও এবং সরকারি সংস্থার সঙ্গে মিলে নারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করছি। তবে বড় পরিসরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।”
মহিলা সংস্থার একজন প্রতিনিধি জানান, “আমরা বাল্যবিয়ে রোধে ২০১৭ সালের বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন বাস্তবায়নের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। এছাড়া নারীদের জন্য দর্জি বিদ্যা, এমব্রয়ডারি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।” তবে তিনি স্বীকার করেন, “জলবায়ু দুর্যোগের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলা করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
বাল্যবিয়ে ও জলবায়ুর প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন বাল্যবিয়ের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা বোঝার জন্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, জলবায়ু দুর্যোগের কারণে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর আয় কমছে। এই অর্থনৈতিক চাপে কন্যাসন্তানকে বিয়ে দিয়ে পরিবারের খরচ কমানোর প্রবণতা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তার অভাব তাদের যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলছে, যা পরিবারগুলোকে মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করছে। তৃতীয়ত, সামাজিক বৈষম্য এবং লিঙ্গভিত্তিক রীতিনীতি নারীদের অভিযোজন ক্ষমতাকে সীমিত করছে, ফলে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাল্যবিয়ে থেকে মুক্তির পথ
বাল্যবিয়ে রোধে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, সাতক্ষীরা জেলা মহিলা সংস্থা ও মহিলাদের নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন এনজিও’র সাথে কথা বলে যা জানা যায়, প্রথমত, শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়লে তাদের বিয়ের বয়স বাড়বে এবং তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। সাতক্ষীরার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা প্রয়োজন। জাতীয় মহিলা সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কাজ করছে, তবে এর পরিধি আরও বাড়ানো দরকার।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। বেড়িবাঁধ সংস্কার, লবণাক্ততা-প্রতিরোধী ফসল চাষ ও বৃক্ষরোপণের মতো পদক্ষেপ কৃষি ও জীবিকার উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয় বাড়াতে পারে।
চতুর্থত, আইনের কঠোর প্রয়োগ। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭ কার্যকর করার জন্য মোবাইল কোর্ট ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। স্থানীয় এনজিও এবং মিডিয়ার মাধ্যমে বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যাই নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর কন্যাসন্তানরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার।

















