তালা প্রতিনিধি ১৮ নভেম্বর ২০২৫ , ১২:২২:৩৫ অনলাইন সংস্করণ
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা—যেখানে লবণাক্ততা, নদীভাঙন আর ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। সেই কঠিন পরিবেশেই শ্রীরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম দেখিয়েছেন কীভাবে দৃঢ় মনোবল, প্রশিক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা একটি পরিবারকে যেমন বদলে দিতে পারে, তেমনি অনুপ্রাণিত করতে পারে একটি পুরো অঞ্চলের মানুষকে।
একসময় কপোতাক্ষ নদে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করেই জীবিকা চলত হালিমের। কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় আয় ছিল অল্প, সংসারের চাহিদা মেটাতে হতো অমানুষিক সংগ্রাম। জীবনের উন্নতির স্বপ্ন থেকে তিনি নদীভাঙনের পাশে জমি কেটে ঘের তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম বছরেই রোগব্যাধি, খারাপ পানি ব্যবস্থাপনা ও ভুল পদ্ধতির কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
এরপর আসে ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফান। এক ঝড়ে ভেসে যায় তাঁর ঘের, নষ্ট হয় সব মাছ। ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন হালিম। ঠিক সেই সময়ে পাশে দাঁড়ায় সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাস) এবং পিকেএসএফ, ইফাদ ও ডানিডার সহায়তায় পরিচালিত আরএমটিপি প্রকল্প। তাঁকে দেওয়া হয় আধা-নিবিড় চাষ পদ্ধতি, পানি ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাবার সরবরাহ, রোগ প্রতিরোধসহ আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং ঘের সংস্কার ও পোনা কেনার আর্থিক সহায়তা।
প্রশিক্ষণের পর ঘেরে নিয়ম মেনে চাষ শুরু করেন হালিম। বাগদা–গলদার পাশাপাশি তেলাপিয়া, পাইকা, রুইসহ সাদা মাছের মিশ্র চাষ করে ঝুঁকি কমিয়ে বাড়ান লাভের পরিমাণ। বর্তমানে তাঁর ৩ বিঘা ঘেরে প্রতি মৌসুমে আয় হয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। শুধু নিজের জীবনই বদলাননি, বরং ৩–৪ জনকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে হয়েছেন এলাকার সফল চাষিদের একজন।
সাসের নির্বাহী পরিচালক শেখ ইমান আলী বলেন, “উপকূলের মানুষের জীবন সবসময়ই কঠিন। আমরা চাই চাষিরা আধুনিক জ্ঞান, সঠিক প্রযুক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাক। আব্দুল হালিমের মতো একজন চাষির ঘুরে দাঁড়ানো শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য অনুপ্রেরণা। আমাদের লক্ষ্য আরও অনেক মানুষকে দক্ষ করে তোলা। উপকূলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে মৎস্যচাষ এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত, এবং আমরা সেই দিকেই কাজ করছি।”
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, “কয়রার ভৌগোলিক পরিবেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনায় এখানে চিংড়ি ও সাদা মাছের অসাধারণ উৎপাদন হয়। আব্দুল হালিম তার জীবন্ত উদাহরণ। আরএমটিপি প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধা-নিবিড় পদ্ধতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধ ঠিকমতো অনুসরণ করায় তিনি সফল হয়েছেন।”
মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু আব্দুল হালিম প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তি থাকলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো যায়। সাস ও আরএমটিপির সহায়তায় তিনি নিজের ভাগ্য বদলে নিয়েছেন, তাঁর সাফল্য এখন অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছে।”
উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মাঝেও আব্দুল হালিমের এই সাফল্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতির গুরুত্ব ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে উপকূলের মৎস্যচাষ হতে পারে দেশের অর্থনীতির এক বড় শক্তি—এটাই যেন তাঁর জীবনের গল্প বলে দেয়।

















