আলী মুক্তাদা হৃদয় ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ , ৭:৩৭:২৮ অনলাইন সংস্করণ
জলবায়ু পরির্বতনের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক ঝুঁকিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের নারী ও শিশুরা। জলবায়ু পরিবর্তন ক্ষতির হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না অনাগত শিশুরাও।
সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান, সিত্রাং, মোখার মতো প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন আছড়ে পড়ছে উপকূলে। এছাড়াও আছে খরা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টির প্রকোপ। ফলে বার-বার বিপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে উপকূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবারের সদস্যদের। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের।
প্রতিনিয়ত লড়াই-সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় উপকূলের মানুষদের। নারী পুরুষের দিনরাত সংগ্রামে জোগাড় হয় দু’মুঠো খাবার। বেশিরভাগেরই জানা নেই তাদের অধিকারের কথা। জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাবে ক্ষতির হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না কৃষকের ফসল, মৎসসম্পদ , পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন।
অতিরিক্ত গরমে মারা যাচ্ছে তাদের ঘেরের মাছ, আবার কখনো ভারি বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ,বন্যা, দাবদাহ এবং অতিবৃষ্টির কারণে অনেক দিন পর্যন্ত স্কুলে যেতে পারে না এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্যের কষাঘাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে।
বয়স্কদের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের শিশুরা অল্প বয়সেই জলবায়ু পরিবর্তনে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে হয় বাসস্থান হারানো ভয় তাদের মনে। লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যেন এসব অঞ্চলের নিয়মিত ঘটনা।
দুর্যোগকালীন সময়ে বিদ্যালয়গুলো সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তখন লেখাপড়ার করার সুযোগ থাকে না। অনেকেই বাসস্থান হারিয়ে উন্নত জীবনের আশায় শহরমুখী, অনেকের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে, বেড়েছে মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার।
জলবায়ু এই পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে।
আধুনিক এই যুগেও কুসংস্কারের কারণে জন্মের পর অবহেলায় বেড়ে ওঠে এসব অঞ্চলের মেয়ে শিশুরা। নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবারের বোঝা মনে করায় অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় এখানকার অধিকাংশ মেয়ে শিশুদের। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে বাড়ছে মা ও শিশু মৃত্যু।
সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ায় বিগত দিনের চেয়ে নদ-নদীতে এবং পুকুরের পানিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। বিশুদ্ধ পানির সংকটে উপকূলীয় বিশাল জনগোষ্ঠী লবণাক্ত পানি ব্যবহার করায় তারা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নোনা পানি পানের কারণে নারীরা জরায়ুর রোগ, গর্ভপাত, স্পর্শকাতর স্থানে ক্ষত কিংবা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে ভুগছেন।
অতিরিক্ত গরম ও অন্যান্য জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা শিশুদের কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। প্রায়ই এলার্জি, চর্মরোগ, ভাইরাস ও ছত্রাকজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এসব অঞ্চলের নারী ও শিশুরা। পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক সংকট ও চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব না, তবে সকলের সম্মলিত প্রচেষ্টায় ক্ষতি কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ মোকাবিলায় রোল মডেল। সরকারি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সম্মলিত প্রচেষ্টায় সচেতনতার মাধ্যমে উপকূলীয় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। পরিবেশ নষ্ট করে নিজের বিপদ ডেকে আনা যাবে না। যার দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে। তাহলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে এনে উপকূলকে দুর্যোগ সহিষ্ণু অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

















