আলী মুক্তাদা হৃদয় ২৭ মে ২০২৫ , ৬:২১:২৫ অনলাইন সংস্করণ
যে কৌশলগুলো জানা জরুরী
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জোয়ারের পানির অনুপ্রবেশের কারণে আরও তীব্র হচ্ছে। নদীগুলোর বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা মাটি, পানি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
এই সংকট কৃষি, জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে নারীদের জীবনে এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। লবণাক্ততার প্রভাব ও ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে উপক‚লীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির প্রবেশ বেড়েছে। এর ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, ফসল উৎপাদন কমছে এবং পানির উৎসগুলো দূষিত হচ্ছে। গাছপালা মরে যাচ্ছে, এবং শস্যশ্যামল প্রকৃতি বালুময় বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সাতক্ষীরার উপক‚লীয় অঞ্চলে এই সমস্যা বিশেষভাবে প্রকট।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটার বাড়লেই উপক‚লের ১০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাবে এবং লবণাক্ততা ৭,৩০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমানে উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার কথা থাকলেও, আইপিসিসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ৩ থেকে ৩.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা উপক‚লীয় অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হুমকি।”
নারীদের উপর প্রভাব : উপকূলীয় এলাকার নারীরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার। লবণাক্ত পানি পানের ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভকালীন খিঁচুনির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগেরর বাসিন্দা শাহানারা খাতুন জানান, “আমরা নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই। পুরুষরা শহরে চলে যায় কাজের খোঁজে, আর আমাদের উপর ঘর-সংসার আর জমির দায়িত্ব পড়ে। গত বছর আমার গর্ভাবস্থায় পানির লবণাক্ততার কারণে শরীর খারাপ হতো। ডাক্তার বললেন, লবণ পানির কারণে আমার রক্তচাপ বেড়েছে। লবণ পানির কারণে পুকুরের মাছ মরে যায়। আমাদের এলাকায় বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট আর স্বাস্থ্য কেন্দ্র দরকার।

শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, “আমার দুই বিঘা জমিতে ধান আর সবজি ফলতো, কিন্তু এখন লবণ পানির কারণে জমি চাষ করা বন্ধ হয়ে গেছে। পানির পাম্পে লবণ পানি ওঠে, খাওয়ার পানি মেলে না। আমার মেয়ের ত্বকে ফুসকুড়ি হয়, আর আমার নিজের শরীরে ব্যথা আর জ্বালাপোড়া। দূর থেকে পানি আনতে গিয়ে দিনের অর্ধেক সময় চলে যায়। আমরা নারীরা ঘর-সংসার আর কাজ দুটোই সামলাই, কিন্তু এখন আর পারি না। সরকার যদি আমাদের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে আর জমিতে ফসল ফলানোর উপায় বলে দেয়, তাহলে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারি।”
গাইনী বিশেষজ্ঞ ড. সাবেরা সুলতানা বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধির কারণে গর্ভবতী নারীদের কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।‘‘নারীরা কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে বেশি জড়িত থাকায়, তারা লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে বেশি আসেন।
তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠী দৈনিক ১৬ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মাত্রার তিন গুণেরও বেশি। এর ফলে জরায়ু রোগ, গর্ভপাত, এবং অপরিণত শিশু জন্মের হার বাড়ছে। এছাড়া, পুরুষরা জীবিকার জন্য শহরমুখী হলে নারীদের উপর সংসার ও কৃষির দায়িত্ব বেড়ে যায়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতির ৮০ শতাংশই নারী, যারা পাচার, যৌন হিংসা, এবং শোষণের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার উপায়ে লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় যে পরামর্শ দিলেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মুহাম্মদ জাহাংগীর আলম
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, যেমন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, স্থাপন করা। এটি পানীয় জলের জন্য নিরাপদ উৎস হিসেবে কাজ করবে। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম হলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি, যা পরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়, যেমন পানীয় জল, সেচ, বা গৃহস্থালি কাজ। এই সিস্টেমে ছাদ, ভূমি বা অন্যান্য পৃষ্ঠ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ফিল্টারিং ও স্টোরেজ ট্যাঙ্কে রাখা হয়।
পানি শোধন ব্যবস্থা: রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপন করে লবণাক্ত পানি থেকে লবণ অপসারণ করা। তবে, এই প্রক্রিয়ায় পরিবেশ দূষণ এড়াতে সতর্কতা প্রয়োজন। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেমে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি সাধারণত ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করা হয়। তবে, যদি এই পানি পানীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হয়, তবে (আরও) সিস্টেমের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিশুদ্ধকরণ করা যেতে পারে। এটি বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায়, যেখানে লবণাক্ততা বা আর্সেনিক দূষণ একটি সমস্যা, সেখানে কার্যকর। (আরও) সিস্টেম বৃষ্টির পানি থেকে সম্ভাব্য দূষক, যেমন বায়ুবাহিত ধূলিকণা বা জৈব পদার্থ, অপসারণ করে নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ করে। এটি স্থাপনের জন্য সরকারিভাবে ও কিছু বেসরকারি এনজিও সংস্থার মাধ্যমে সহযোগিতা পাওয়া যায়।
টিউবওয়েল রক্ষণাবেক্ষণ: গভীর নলকূপ স্থাপন এবং নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে লবণাক্ততার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিও থেকে টিউবওয়েল গভীর নলক‚প পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট অফিস বা এনজিও এর কার্যালয়ে আবেদনের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া জেনে নিন।
কমিউনিটি-ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা: স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের স¤পৃক্ত করে পানি বিতরণ ও পরিচালনার কমিটি গঠন করা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, “উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, ও কালিগঞ্জে লবণাক্ততার প্রভাবে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে, যা ধান ও শাকসবজির উৎপাদন ৪০-৫০% কমিয়ে দিয়েছে। তবে, সঠিক কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করতে পারি। নারী কৃষকরা, যারা আমাদের কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাদের জন্য বিশেষ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।”
কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলাম আরও বলেন বলেন, “লবণাক্ততার সংকট কৃষি ও জীবিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা এর প্রভাব কমাতে পারি। কৃষকরা আমাদের কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে বিনামূল্যে পরামর্শ ও সহায়তা পাবেন। একসঙ্গে কাজ করলে আমরা লবণাক্ততার এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো।”
লবণ-সহনশীল কৃষি পদ্ধতি লবণ-সহনশীল ফসল চাষ: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত লবণ-সহনশীল ধানের জাত (যেমন, ব্রি ধান ৭৮, ৮৯, ৯৭) এবং শাকসবজি (যেমন, লবণ-সহনশীল টমেটো, পালংশাক) চাষ বাড়ানো।
বিকল্প ফসল: লবণাক্ত মাটিতে উপযোগী ফসল যেমন, তরমুজ, কুমড়ো, এবং সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
জৈব কৃষি: জৈব সার ও কম্পোস্ট ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনা এবং লবণাক্ততার প্রভাব কমানো।
বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নদী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ: নদীর বেড়িবাঁধ মেরামত ও উন্নত করে লবণ পানির অনুপ্রবেশ রোধ করা। উচ্চতর ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো।
নদী খনন: নদীগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখতে নিয়মিত খনন করা, যাতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং লবণ পানির প্রভাব কমে।
ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ: সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন লবণ পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে। এই বন সংরক্ষণ ও পুনর্বনায়ন করা জরুরি।
স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধি স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন: উপকূলীয় এলাকায় নারীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে লবণাক্ত পানির কারণে সৃষ্ট রোগ (যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা) চিকিৎসা দেওয়া হবে।
সচেতনতা প্রচার: লবণাক্ত পানির স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে প্রচারণা চালানো। স্কুল, কলেজ, এবং কমিউনিটি কেন্দ্রে শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম আয়োজন করা।
পানির গুণগত মান পরীক্ষা: টিউবওয়েল ও পুকুরের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করে লবণাক্ততার মাত্রা নির্ধারণ এবং জনগণকে সতর্ক করা।
বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন : নারীদের জন্য হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, হস্তশিল্প, এবং ছোট ব্যবসার প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা কৃষির উপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
মৎস্য চাষে উদ্ভাবন: লবণাক্ত পানিতে চিংড়ি বা অন্যান্য মাছের চাষে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
নারীদের ক্ষমতায়ন: নারীদের নেতৃত্বে কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রকল্প গঠন, যেমন পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি বা কৃষি সমবায়, যা তাদের আর্থিক স্বাধীনতা দেবে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নীতি প্রণয়ন: সরকারের পক্ষ থেকে লবণাক্ততা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন, যেমন জলবায়ু অভিযোজন তহবিল ব্যবহার করে পানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা।
সতর্কতামূলক পদক্ষেপ পানি পরীক্ষা ও সচেতনতা: স্থানীয় জনগণকে পানির লবণাক্ততা পরীক্ষার সরঞ্জাম ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিরাপদ পানির উৎস চিহ্নিত করতে সহায়তা করা।
পরিবেশ সংরক্ষণ: অবৈধ লবণ পানির চিংড়ি চাষ বন্ধ করা এবং পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি গ্রহণ করা।জরুরি প্রস্তুতি: ঘূর্ণিঝড় বা জোয়ারের সময় লবণ পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ, যেমন অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।
অবৈধ চিংড়ি চাষ বন্ধ: লবণ পানির চিংড়ি চাষ কৃষিজমি ও পানির উৎসের ক্ষতি করে। এটি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া।
পরিবেশবান্ধব কৃষি: লবণ-সহনশীল ফসল চাষ এবং জৈব সার ব্যবহার করে মাটির লবণাক্ততা কমানো।
সতর্কতা থাকতে যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন
সচেতনতা বৃদ্ধিশিক্ষামূলক প্রচারণা: লবণাক্ত পানির স্বাস্থ্য ঝুঁকি (যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, গর্ভকালীন জটিলতা) সম্পর্কে স্থানীয় মানুষকে সচেতন করতে স্কুল, মসজিদ, বা কমিউনিটি কেন্দ্রে কর্মশালা আয়োজন।
মিডিয়া ব্যবহার: রেডিও, টেলিভিশন, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লবণাক্ত পানির ক্ষতি এবং সতর্কতার উপায় সম্পর্কে প্রচার।
নারীদের সম্পৃক্ততা: নারীদের জন্য বিশেষ সচেতনতা প্রোগ্রাম, কারণ তারা পানি সংগ্রহ ও গৃহস্থালি কাজে বেশি জড়িত।
নিরাপদ পানি ব্যবহারের অভ্যাসপানি ফুটানো বা ফিল্টার: লবণাক্ত পানির পরিমাণ কমাতে সাশ্রয়ী ফিল্টার বা ফুটানোর পদ্ধতি ব্যবহার করা।
বিকল্প উৎস ব্যবহার: যদি স্থানীয় পানির উৎস লবণাক্ত হয়, তবে সরকার বা এনজিও’র সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা।পানি সংরক্ষণের সতর্কতা: পানির পাত্রে ঢাকনা ব্যবহার করা এবং লবণাক্ত পানির সংস্পর্শ এড়ানো।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: লবণাক্ত পানির কারণে সৃষ্ট রোগ (যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের সমস্যা) প্রতিরোধে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।
পুষ্টিকর খাবার: লবণাক্ত পানির প্রভাব কমাতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, যেমন ফলমূল ও শাকসবজি, যা শরীরে পানিস্বল্পতা কমায়।
গর্ভবতী নারীদের সতর্কতা: গর্ভবতী নারীদের বিশুদ্ধ পানি পানে উৎসাহিত করা এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়মিত পরীক্ষা করানো।
জরুরিভাবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি: ঘূর্ণিঝড় বা জোয়ারের সময় লবণ পানির প্রবেশ ঠেকাতে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি বা বাড়ির চারপাশে উঁচু বাধা নির্মাণ।
জরুরি পানি সরবরাহ: জরুরি সময়ের জন্য বিশুদ্ধ পানি বোতলে বা পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখা।
আশ্রয় কেন্দ্রে যোগাযোগ: ঘূর্ণিঝড়ের সময় স্থানীয় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া, যেখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকতে পারে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ.ন.ম গাউছার রেজা বলেন, “বাংলাদেশের জন্য পরিবেশের ঝুঁকি মোকাবিলা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অগ্রাধিকার। লবণাক্ততা এবং পানি দূষণের ফলে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকাল মৃত্যু হচ্ছে, যা জিডিপির ১৭.৬ শতাংশ ক্ষতির কারণ।
তিনি আরও বলেন, “শ্যামনগর, আশাশুনি, এবং কালিগঞ্জের মতো উপজেলাগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির লবণাক্ততা ১০-১৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত বেড়েছে, যা ধান ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, পানীয় জলের উৎসগুলো লবণাক্ত পানিতে দূষিত হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নারীরা এই সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী। তারা পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ায়। গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভকালীন জটিলতা বাড়ছে, যা লবণাক্ত পানির সরাসরি প্রভাব।”
আ.ন.ম গাউছার রেজা আরও বলেন, “উপকূলীয় নারীরা কেবল ক্ষতিগ্রস্তই নন, তারা এই সংকট মোকাবিলায় ফ্রন্টলাইনে লড়ছেন। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবিকা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।” লবণাক্ততা বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে নারীদের জীবনে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, লবণ-সহনশীল ফসল চাষ, এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উপক‚লীয় এলাকার জনগণ, বিশেষ করে নারীদের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।

















