আলী মুক্তাদা হৃদয় ৩০ এপ্রিল ২০২৬ , ৩:০৫:৩৭ অনলাইন সংস্করণ
জেনে নিন কেন বজ্রপাত হয়
বজ্রপাতের সময় নিরাপদে থাকার উপায়
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপ কী
আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নে বজ্রাঘাতে এক ঘের ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত এমডি সুমন হোসেন (২৮) দক্ষিণ একসরা গ্রামের আঃ মান্নান মোল্লার পুত্র।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সুমন প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে দক্ষিণ একসরা বিলে তার মৎস্য ঘেরে যান। রাতে ঘেরের বাসায় বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে আঃ জলিল নামের এক ব্যক্তি কাঁকড়া কিনতে গিয়ে সুমনকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পরিবারের সদস্যদের খবর দিলে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
বৃহস্পতিবার আছর নামাজের পর দক্ষিণ একসরা জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি পিতা-মাতা, স্ত্রী ও এক পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।
কেন বজ্রপাত হয়
বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারণগুলোর মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে প্রথম ও প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। যদিও অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।
বাংলাদেশের দক্ষিণ থেকে আসা গরম আর উত্তরের ঠান্ডা বাতাসে সৃষ্ট অস্থিতিশীল আবহাওয়ায় তৈরি হয় বজ্র মেঘের। এ রকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে হয় বজ্রপাত। এ সময় উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন সবচেয়ে কাছে যা পায় তাতেই আঘাত করে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগলিক অবস্থান। একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে আসছে গরম আর আর্দ্র বাতাস। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। কিছু দূরেই হিমালয় পর্বত। যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসে। এই দুই জায়গা থেকে আসা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ.ন.ম গাউছার রেজা বলেন, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ৫০ ভাগ বেড়ে যায়। গত কয়েক দশকে বড় বড় গাছ কেটে ফেলাও তার একটি কারণ। উঁচু গাছপালা বজ্রনিরোধক হিসেবেও কাজ করে। খোলা স্থানে মানুষের কাজ করা এবং বজ্রপাতের বিষয়ে অসচেতনতাও বজ্রপাতে প্রাণহানি ব্রদ্ধির জন্য দায়ী।
এপ্রিল থেকে জুন এর মধ্যেই বেশি বজ্রপাত বেশি হয়ে থাকে। বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে বজ্রপাতের সম্পর্ক রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলে বায়ুমন্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, তাই বেশি বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে। বনায়ন কমে গেলে তাপমাত্রা ব্রদ্ধি পায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, গ্রিন হাউস কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে গাছপালার খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করে।
বর্তমান সময়ে বজ্রপাত বেড়েছে উল্লেখ করে আ.ন.ম গাউছার রেজা আরও বলেন, ‘ইদানীং বজ্রপাত অনেক লোক মারা যাচ্ছে। আমরা সাধারণত দেখতে পাই যে তাপমাত্রা বেড়েছে। বজ্রপাত বাড়ার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, আমাদের ইকনোমিক অ্যাক্টিভিটি বেড়েছে।’
‘এছাড়াও বলা যায়, বজ্রপাতের যে তীব্রতা ছিল তাও কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে যেখানে বেশি লোক বজ্রপাতে মারা যায়, তাদের কার্যক্রম ব্রদ্ধি পাওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে। আর আগের চেয়ে বজ্রপাত রিপোর্টিং সিস্টেমটাও বেড়েছে’।
বজ্রপাতের সময় নিরাপদে থাকার উপায় ও করণীয়
* বজ্রঝড় সাধারণত ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করুন। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাবেন, এটি বজ্রঝড় বা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেবে।
* বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলামাঠে যদি থাকেন তাহলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে।
* বজ্রপাতের আশংকা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ভবনের ছাদে বা উঁচু ভূমিতে যাওয়া উচিত হবে না।
* বজ্রপাতের সময় যে কোন ধরণের খেলাধুলা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে, ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে হবে।
* খালি জায়গায় যদি উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থাকে, তার কাছাকাছি থাকবেন না। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে থাকা বিপজ্জনক ।
* বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়াই উচিৎ হবে। সমুদ্রে বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
* যদি কেউ গাড়ির ভেতর অবস্থান করেন, তাহলে গাড়ির ধাতব অংশের সাথে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে দেড়’শোর মত মানুষ মারা যান।
সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী,এসব অঞ্চলে বেশি বজ্রপাত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আবহাওয়ার নানা ফ্যাক্টরের কারণে একেক অঞ্চলে একেক সময়ে বজ্রপাত কম বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন-
* পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনে এর ভূমিকা সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ এবং কার্যক্রম গ্রহণ।
* বজ্রপাত শনাক্তকরণ ও পূর্বাভাস পদ্ধতির আধুনিকায়ন।
* বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কার্যকরী পদ্ধতি বের করা।
* দেশের বজ্রপাত প্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা।
* বজ্র নিরোধক দন্ড প্রতিটা বিল্ডিং-এ লাগানোর বিষয়টি বিল্ডিং কোডে বাধ্যতামূলক করা।
* বজ্রপাত বিষয়ক সচেতনতা শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
* বজ্রপাতে আহতদের প্রাথমিক সেবা সংক্রান্ত বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
* দ্রুত বর্ধনশীল উঁচু জাতের বৃক্ষরোপণ।

















