সাতক্ষীরা

ড্রেন নয়, যেন ময়লার খাল

  মো. রাজু সিদ্দিকী ৮ জুলাই ২০২৫ , ১০:৩১:২০ অনলাইন সংস্করণ

ভাসছে শহর, জমছে দুর্গন্ধ আর ক্ষোভ — বর্ষা এলেই ভয়াবহ বিপর্যয়

পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত সাতক্ষীরার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চলাচল যেন এখন দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। এখানকার প্রধান পানি নিষ্কাশনের ড্রেনটি যেন আর ড্রেন নয়, রীতিমতো ময়লার খালে রূপ নিয়েছে। দিনের পর দিন ড্রেনের মুখে জমে থাকা বর্জ্য—পলিথিন, ডাবের খোসা, খাবারের প্যাকেট আর বাসাবাড়ির আবর্জনা—পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় তা উপচে পড়ছে রাস্তার ওপর। সঙ্গে আছে তীব্র দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও একের পর এক দুর্ঘটনা।

রাস্তায় কাদা, পিচ্ছিল জমা পানি আর দুর্গন্ধের কারণে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রিকশাচালক, অফিসগামী মানুষ—সবাই এখন ভোগান্তিতে। নাগরিক সেবার এমন হাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে, আর এই বর্ষায় উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে।

দক্ষিণ পলাশপোল এলাকার মূল সড়কজুড়ে জমে আছে ড্রেনের নোংরা পানি। ফুটপাত বলে কিছু নেই, সড়কের একপাশ ভাঙা, অন্য পাশে কাদা। চলাচলের সময় প্রায়ই মানুষ পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দোকানের সামনের অংশ পর্যন্ত পানি থৈ থৈ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, ড্রেনের পানি দোকানে ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

পৌরসভার কর্মীদের এমন পরিস্থিতির মধ্যে দেখা যায় না বললেই চলে। নিয়মিত ময়লা পরিষ্কারের জন্য কোনো নিয়োজিত কর্মী নেই। যেখানে সমস্যা প্রকট সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবতা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ড্রেনের কাজ ড্রেন করছে না!
ড্রেন মূলত একটি শহরের রক্তনালির মতো, যা জমে থাকা বা ব্যবহার হওয়া পানিকে বর্জ্য হিসেবে বাইরে ফেলতে সাহায্য করে। কিন্তু সাতক্ষীরা শহরের এই ওয়ার্ডে ড্রেনের মুখগুলো প্রায় এক বছর ধরে অচল। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ড্রেনটি শুধু পানি চলাচলের ক্ষমতা হারায়নি, বরং এটি দুর্গন্ধ ছড়ানো ও রোগবাহী মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এলাকার একজন বয়স্ক বাসিন্দা আব্দুল করিম (৬৫) বলেন, “আমি গত ৩০ বছর ধরে এখানে আছি। এমন অবস্থা এর আগে কখনো হয়নি। আগে মাঝে মাঝে পৌরসভার লোকজন এসে পরিষ্কার করত, এখন তো তারা আসেই না।”

মটর গ্যারেজ মালিক জাফর জানান, “ময়লা মাটি জমে পানি নামছে না। ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে, গাড়ি পরিষ্কার রাখা যাচ্ছে না। যত জলাবদ্ধতা, সব আমাদের দোকানের সামনে।”

ভ্যানচালক শরিফুল বলেন, “রাস্তার উপর পানি, তার উপর কাদা। চালাতে গিয়ে পিচ্ছিল হয়ে পড়ে গেছি একবার। এমন দুর্ঘটনা প্রতিদিন হচ্ছে।”

ভেনাস মোটরসাইকেল শোরুমের হাফিজ জানান, “এই ড্রেনটা শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না। অনেক পুরনো, সংকীর্ণ আর ভেতরে অনেক বাঁক। বাইরের দিকে সম্প্রসারণ করলেই উপকার হবে।”

সুন্দরবন পরিবহনের ম্যানেজার বলেন, “দোকানদারদেরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের দোকান থেকে পলিথিন ফেলে ড্রেন বন্ধ করছেন তারাও।”

সাতক্ষীরা পৌরসভার সাবেক কমিশনার শফিকুল আলম বাবু হৃদয় বার্তাকে জানান, “জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবহেলা আর অচেতনতার মিশেলে এমন দুরবস্থা। সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।”

মশা, দুর্গন্ধ ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা:
জলাবদ্ধতা ও জমে থাকা ড্রেনের পানিতে মশার প্রজনন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ও পেটের অসুখ এই ধরনের পরিবেশে দ্রুত ছড়ায়। সাতক্ষীরা শহরের এই এলাকাগুলো তাই এখন জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে ফেলেছে।

কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কোথায়?
পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো তৎপরতা বা আশ্বাস পাওয়া যায়নি। অভিযোগ আছে, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা বিভাগ পুরো বিষয়টি অবহেলা করছেন। এমনকি নাগরিকদের বহু আবেদন ও লিখিত অভিযোগও ফলপ্রসূ হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য।

স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ড্রেন পরিষ্কার ও সম্প্রসারণ কাজ শুরু করতে হবে। পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত ‘পরিষ্কার সপ্তাহ’ ঘোষণা করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা। ময়লা ফেলা ঠেকাতে জনগণকে সচেতন করতে লিফলেট, মাইকিং ও প্রচারণা চালাতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কুল, কলেজ ও দোকানঘরগুলোতে সভা/ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত স্থানের বাইরে বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে জরিমানা কার্যকর করতে হবে।

আরও খবর