আলী মুক্তাদা হৃদয় ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৫:৪৪:১৪ অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের মানচিত্রে উপকূলীয় সাতক্ষীরা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। একদিকে আছে সুন্দরবনের অরণ্য, অন্যদিকে আছে বিস্তীর্ণ ঘেরের চিংড়ি খামার। চিংড়ি এখন শুধু খাবার নয়, এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ এই চিংড়ি চাষই আজ সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।
শ্যামনগর, আশাশুনি আর দেবহাটার হাজারো চাষির মুখে প্রতিনিয়ত শোনা যায় লোকসানের গল্প। কখনো হঠাৎ বৃষ্টিতে ঘের ভেসে যায়, কখনো লবণাক্ততা বেড়ে যায় এতটা যে চিংড়ি বাঁচে না, আবার কখনো অতিরিক্ত তাপে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে অনেকে ঘের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।
তবু হতাশার অন্ধকারে আশার আলো জ্বালছে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ। সরকারি অনুদান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চাষিদের অভিযোজন ক্ষমতাই দেখাচ্ছে টেকসই ভবিষ্যতের দিশা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: সাতক্ষীরার জীবনে বহুমাত্রিক ক্ষতি
সাতক্ষীরার মানুষ বছরের পর বছর ধরে লড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে। তবে গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি
চিংড়ির জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ২৬.৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এখন গ্রীষ্মকালে পানির তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। এতে চিংড়ির বৃদ্ধির হার কমে যায়, রোগ বাড়ে এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
আশাশুনির চাষি শহিদুল ইসলাম বললেন, “গরম এত বেড়ে যায় যে পানি গরম হয়ে ওঠে। চিংড়ি উঠে আসে পানির উপর ভেসে। দুদিন এভাবে থাকলেই মরতে শুরু করে।”
লবণাক্ততার ওঠানামা
বৃষ্টি বেশি হলে মিষ্টি পানির প্রবাহ বেড়ে ঘেরে লবণ কমে যায়। আবার খরায় বা উজানের পানি না এলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। এই হঠাৎ পরিবর্তন চিংড়ির জন্য মারাত্মক।
শ্যামনগরের মৎস্যচাষি আবুল কালাম বলেন, “একদিন বৃষ্টি হলে লবণ কমে যায়, পরের দিন রোদ উঠলে আবার বেড়ে যায়। এই ওঠানামা চিংড়ি সহ্য করতে পারে না।”
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
উপকূলের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবার ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ ভেঙে গেলে ঘের ভেসে যায়। ২০০৯ সালে আইলায় হাজারো ঘের ধ্বংস হয়েছিল। ২০২০ সালের আম্পানেও একই চিত্র দেখা যায়।
স্থানীয় চাষি রহমত আলী বলেন, “এক রাতের ঝড়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে যায়। পুরো মৌসুম শেষ হয়ে যায়। ঋণ শোধ করার উপায় থাকে না।”
জীবিকার অনিশ্চয়তা
লোকসান গুনতে গুনতে অনেকে ঋণের জালে আটকে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ঘের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ইটভাটায় বা শ্রমিকের কাজে। এতে সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে।
আশাশুনির রহিমা খাতুন বলেন, “মহিলা হয়ে ঘের সামলানো সহজ না। কিন্তু ঘরের খরচ চালাতে বাধ্য হয়েছি। প্রথম দুই বছর ঘূর্ণিঝড়ে সব শেষ হয়ে গেল। পরে সরকারি ট্রেনিং নিয়ে শিখেছি পানি পরীক্ষা করতে হয়, ঘের শক্ত করতে হয়। এখন ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।”
শ্যামনগরের বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া, “তিন বছর আগে পর্যন্ত একটানা লোকসান। পরিবার চালানোই মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। জলবায়ুর কারণে কখন যে ঘের নষ্ট হবে বুঝতে পারতাম না। এখন ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক চাষ শিখছি।”
একই এলাকার শহিদুল ইসলাম, “বৃষ্টি হলে লবণ কমে যায়, রোদ উঠলে বেড়ে যায়। এই অবস্থায় চিংড়ি বাঁচে না। আগে এগুলো বুঝতাম না। এখন নিয়মিত পরীক্ষা করি। তাতে ক্ষতি কিছুটা কমেছে।”
দেবহাটার আমিরুল ইসলামের সাফল্যের গল্প
অন্ধকার থেকে আলো-দেবহাটার মো. আমিরুল ইসলাম একসময় ছিলেন দিশেহারা। বারবার লোকসান গুনে সংসার চালানোই ছিল দুঃসহ। কিন্তু মৎস্য অধিদপ্তরের SCMFP প্রকল্প তাঁর জীবনে আশার আলো হয়ে আসে। তিনি পান ২,১৪,৬৭৮ টাকা অনুদান। এই অর্থে কেনেন মানসম্মত খাদ্য, চুন, ব্লিচিং, মোলাসেস, প্রোবায়োটিকস এবং ভাইরাসমুক্ত PL।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঘেরের মাটি ও পানির মান পরীক্ষা শুরু করেন। প্রতিটি ধাপ রেকর্ড রাখেন। পানি গুণগত মান অনুযায়ী সমন্বয় করেন।
আগে উৎপাদন ছিল ১.৮ কেজি/শতাংশ, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.২ কেজি/শতাংশ। এক মৌসুমে তিনি উৎপাদন করেছেন ৬২৫ কেজি চিংড়ি। বিক্রি করে আয় ৯,০৬,২৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ টাকা নিট লাভ।
এই অর্থে তিনি সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছেন, উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছেন, এমনকি জমিও কিনেছেন।
আমিরুল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমার জীবনমান উন্নয়নের জন্য মৎস্য অফিস যা করেছে, তা নিজের বাবা-মা কিংবা আত্মীয়-স্বজনও করেনি।”
SCMFP প্রকল্প কি সবাইকে সাহায্য করছে?
SCMFP প্রকল্প মূলত প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা প্রদান করছে। সবাইকে একসঙ্গে অনুদান দেওয়া সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে তালিকাভুক্ত চাষিদের মধ্যে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। যেসব চাষি প্রকল্পের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছেন, তারা প্রশিক্ষণ, অনুদান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছেন।
সাহায্য পেতে করণীয়-
১. স্থানীয় মৎস্য দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
২. নিজের ঘের, চাষের অভিজ্ঞতা ও ক্ষতির বিবরণ দিয়ে আবেদন জমা দিতে হবে।
৩. প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হবে, কারণ প্রশিক্ষণ ছাড়া অনুদান দেওয়া হয় না।
৪. ভাইরাসমুক্ত চখ ব্যবহার, ঘেরের মাটি-পানি পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণে অঙ্গীকার করতে হয়।
সরকারি অনুদান কিভাবে পাওয়া যাবে?
সরকারি অনুদান সরাসরি নগদ অর্থ আকারে না দিয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে সরঞ্জাম, ভাইরাসমুক্ত চখ, খাদ্য, চুন, ব্লিচিং ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আকারে প্রদান করা হয়। এর জন্য উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নাম নিবন্ধন করতে হয় এবং প্রকল্পের যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীরা অনুদান পান।
সাতক্ষীরার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও আগ্রহী চাষিদের আগে সহায়তা দিতে। SCMFP প্রকল্প থেকে অনুদান পেতে হলে মৎস্য দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক চাষে আগ্রহী হতে হবে।”
প্রতিরোধের উপায়
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম বলছেন, জলবায়ুর ধাক্কা পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না। তবে অভিযোজনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
নিয়মিত পানি ও মাটি পরীক্ষা করতে হবে। কেবল ভাইরাসমুক্ত চখ ব্যবহার করতে হবে। প্রোবায়োটিকস, চুন ও ব্লিচিং ব্যবহার করতে হবে নিয়মিত। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এয়ারেটর ও ছায়া জাল ব্যবহার কার্যকর। ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে শক্ত বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। জলচক্র ব্যবহার করে পানির অক্সিজেন ঠিক রাখা। মৌসুম অনুযায়ী ফসল বৈচিত্র্য আনতে হবে, যেমন চিংড়ির সঙ্গে কাঁকড়া বা মাছ চাষ।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি. এম. সেলিম আরও বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন একটা বাস্তবতা। আমরা এটা ঠেকাতে পারব না, কিন্তু অভিযোজন করতে পারব। চাষিদের আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদন তিনগুণ বেড়েছে। SCMFP প্রকল্পের মাধ্যমে চাষিদের অনুদান ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতিটি চাষিকে টেকসই ব্যবস্থাপনায় আনা। উপকূলের মানুষ যদি বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ করে, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনকে সুযোগে রূপ দিতে পারবে।”
সাতক্ষীরার উপকূলের চাষিদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন একদিকে ভয়, অন্যদিকে সুযোগ। ঝুঁকি যত বাড়ছে, অভিযোজনের পথও ততই স্পষ্ট হচ্ছে।
আশাশুনির তরুণ চাষি আব্দুল আলিম বললেন, “আমরা যদি বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ করি, তাহলে জলবায়ু যতই বদলাক, আমরা টিকে থাকতে পারব।”
এই আত্মবিশ্বাসই প্রমাণ করছেসাতক্ষীরার উপকূল একদিন আবারও দেশের চিংড়ি উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে।
জলবায়ু পরিবর্তন সাতক্ষীরার মানুষকে দিশেহারা করে দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোজনের নতুন শিক্ষা দিয়েছে। একসময় হতাশায় ভরা যে চাষিদের জীবন, আজ তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।

















