শ্যামনগর

তিন মাসের অপেক্ষার অবসান, ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার

  নিজস্ব প্রতিনিধি ২৫ আগস্ট ২০২৬ , ৫:৪১:৫২ অনলাইন সংস্করণ

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবনের দুয়ার। আর মাত্র কয়েক দিন পরই সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ পাবেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালিরা। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হবে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ফলে দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা বননির্ভর মানুষদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি ও নতুন করে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা।

চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় প্রতিবছরের মতো এবারও এই তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ সময় জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি, গোলপাতা সংগ্রহকারীসহ পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য কোনো পাস বা অনুমতিপত্র দেওয়া হয়নি।

বন বিভাগ বলছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজনন মৌসুম। এ সময় নদী-খালে মাছ ডিম ছাড়ে, বন্যপ্রাণীরা প্রজনন করে এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ থেকে নতুন চারা জন্ম নেয়। মানুষের বিচরণ ও নৌযানের শব্দ কম থাকলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ পায়। তাই সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বননির্ভর উপকূলীয় এলাকার মানুষ। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করেই যেসব পরিবার বছরের বড় একটি সময় সংসার চালায়, তাদের জন্য টানা তিন মাস কর্মহীন থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে ধারদেনা করেছেন, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়ে সংসারের খরচ চালিয়েছেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা জিন্নাত গাজী বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকার সময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন বন খুলবে, এটাই বড় আশার বিষয়। বন থেকে মাছ-কাঁকড়া ধরতে পারলে আবার আয়-রোজগার শুরু হবে।

বুড়িগোয়ালিনীর জেলে রিপন গাজী বলেন, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের জন্য এই সময়টা খুব কঠিন। ধারদেনা করে দিন পার করতে হয়েছে। বন খুললে আবার আয়-রোজগার শুরু হবে। তাই নৌকা, জালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত করছি।

শুধু জেলে-বাওয়ালিরাই নন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নৌযান মালিক, মাঝি, শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ অনেক মানুষও তিন মাস কর্মহীন ছিলেন। সুন্দরবন বন্ধ থাকায় পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের আয়ও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছর নিষেধাজ্ঞার আগে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা রেঞ্জে প্রায় ২৫০টি ইঞ্জিনচালিত পর্যটন নৌযান রয়েছে এবং এসব নৌযানের সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক যুক্ত।

নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উপকূলীয় জনপদে বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা মেরামত করা হচ্ছে। পুরোনো জাল ধুয়ে শুকানো, ছেঁড়া অংশ মেরামত, নৌকার ইঞ্জিন পরীক্ষা, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ—সব মিলিয়ে জেলেপল্লিতে এখন ব্যস্ত সময় কাটছে।

অনেক জেলে বলছেন, তিন মাস বন্ধ থাকার সময় যে ঋণ হয়েছে, তা পরিশোধের বড় ভরসা এখন সুন্দরবন। তবে বন খুললেই আগের মতো আয় হবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। আবহাওয়া, নদীর পানির অবস্থা, মাছ-কাঁকড়ার পাওয়ার পাশাপাশি বাজারদর এবং বন বিভাগের নিয়ম মেনে চলার ওপর তাদের আয় অনেকটাই নির্ভরশীল।

বননির্ভর মানুষেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়া গেলে তাদের ঋণের বোঝা কিছুটা কমত। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞায় জেলে পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবিও দীর্ঘদিনের।

এদিকে সুন্দরবন খোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে বন বিভাগ। জেলে-বাওয়ালিদের বৈধভাবে পাস-পারমিট দেওয়া, নৌযান ও বনজীবীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সরকারি বনসংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান জানিয়েছেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন আবার সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশ যৌথভাবে নজরদারি চালিয়েছে।

বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য সুন্দরবনের প্রজনন মৌসুমকে নির্বিঘ্ন করা হলেও এ সময়েও কিছু অসাধু ব্যক্তি গোপনে বনে প্রবেশের চেষ্টা করেছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে প্রবেশের অভিযোগে ৪৪ জনকে আটকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সুন্দরবন খুলে দেওয়ার পর বৈধ বনজীবীদের পাশাপাশি কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার এবং বন্যপ্রাণী শিকারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে না, দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থাকেও হুমকির মুখে ফেলে।

তাই বন খুলে দেওয়ার পর বৈধ জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধভাবে বনে প্রবেশকারী ও বনজ সম্পদ লুটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সুন্দরবন খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও ফিরবে প্রাণচাঞ্চল্য। দীর্ঘ তিন মাস পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকায় নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বন বিভাগের ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থায় পর্যটকদের নির্ধারিত স্পটের টিকিট সংগ্রহ ও অনুমোদিত নৌযানের মাধ্যমে ভ্রমণের ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া রাতে অবস্থান না করা, একা বনে না যাওয়া এবং নদী-খালের পানিতে নামা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবন শুধু উপকূলের মানুষের জীবিকার উৎস নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন। ফলে বনজীবীদের জীবিকা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই বন ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে ১ সেপ্টেম্বর শুধু নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না এটি নতুন করে কাজ ও আয়-রোজগারে ফেরার দিন। দীর্ঘ তিন মাসের কর্মহীনতা, ধারদেনা ও অনিশ্চয়তার পর জেলে-বাওয়ালিরা এখন স্বপ্ন দেখছেন আবার নদীতে নৌকা নামানোর।

তবে সুন্দরবন থেকে জীবিকা নিতে গিয়ে যেন বনটির ক্ষতি না হয় সেদিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ রয়েছে। বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অবৈধ জাল ব্যবহার, বন্যপ্রাণী শিকার, অতিরিক্ত আহরণ এবং অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ বন্ধ করতে পারলেই নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আরও খবর